নির্বা

শ্্রীপ্রতিম। ঠাকুর

এই গ্রন্থে মুদ্রিত রবীন্দ্রনাথের প্রতিরূতি লেখিকা-কর্তৃক অস্কিত ৬৯ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত চিঠি রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরিত শেষ পত্র__ ইহাই তাহার শেষ স্বাক্ষর |

প্রথম সংস্করণ_-১ বৈশাখ, ১৩৪৯

প্রকাশক- শ্রীপুলিনবিহারী সেন বিশ্বভারতী, ৬৩, দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, কলিকাতা

মুদ্রাকর-__প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যাক্স * শান্তিনিকেতন প্রেস, শান্তিনিকেতন

“স্সেহের অজঅতায়

সমাপ্তির শেষ কথ!

চিন্তে দিয়ে গেলে ভরে

সেই নীরব কণ্ঠের বাণীর ইঙ্গিত পূর্ণ ক'রে থাক্‌ আমাদের নিত্য নিবেদনের থালা ॥”

১৯৪০ সালের অগস্টের শেষে বর্ধামঙ্গলের আয়োজন বাবামশায়ের;১ আদেশে শুরু করা হোলো কিন্তু আমার পক্ষে উৎসক পর্যস্ত থাক! সম্ভব হোলো না। অন্থস্থতার দরুন বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানের পূর্বেই আমাকে কালিম্পও যাত্র। করতে হোলে! রওন| হবার পূর্বদিন সন্ধ্যর পর বাবামশীয়ের কাছে বিদায় নিতে উদদীচীতে গেলুম, কেননা, ভোরের গাড়িতে কলকাতা যেতে হবে।

দেখি, উদীচীর উপরের বারাণ্ডায় চুপ ক'রে বসে আছেন, তখন রাত হয়েছে অনেক, সামনে দীর্ঘ বকায়ন গাছের ঘন ছায়া পড়েছে বারাণ্ায়, মাথার উপর তারাগুলে। স্তৰ্ধ। তার পায়ের কাছে বসতে, বললেন, “ভালো করে সেন্নে এসো মা। আমিও ছুটির পর মৈত্রেয়ীরৎ ওখানেই যাব, তুমি পরে ওখানেই এসো 1” তীর স্নেহপুর্ণ কণ্ঠস্বর কান থেকে যেন এখনো মুছে যায়নি। তার পর কলকাতা হয়ে অগস্ট মাসের শেষে পাহাড়ের দিকে যাত্র! করলুম। মংপুতে মাঝ-রাস্তায়

১. গুরুদেব 3. উদ্তরারণে কবিয় শেষ-সময়কার বাসগৃহ ৩. ভ্রীমৈত্রেরী দেবী

নির্বাণ

এক সপ্তাহের জন্য থেমেছিলুম সেখানে তার এই চিঠিখানি পাই £

বৌমা,

তোমার বাড়িটা দেখি শুন্য হাঁ হাঁ করছে, না আছ তুমি, না আছে রথী, প্রধান ব্যক্তি যে, সে আছে নাথু১ নিদারুণ শরতের তাপ আকাশে এসেছে, কপণ-বর্ণ কালো মেঘের ভিতর থেকে সমস্ত পৃথিবীকে অভিশাপ দিচ্ছে। হংসবলাকার দলে যদি নাম লেখা থাকত তাহলে উড়ে চলতুম মানস-সরোবরের দিকে মংপুতে মাগুরমাছের সরোবর-তীরেও হয়তো শান্তি পাওয়া যেতে পারত। মধ্য-সেপ্টেম্বরের প্রতীক্ষায় রইলুম

গল্পটা শেষ হয়ে গেছে, এখন তাতে প্র্যাস্টার লাগাচ্ছি। আজ রাঁতে দেবতা যদ্দি প্রসন্ন থাকেন তাহলে গ্রন্থাগারের প্রাঙ্গণে বর্ধামঙ্গল হবে। সকালে বৃক্ষরোপণ হয়ে গেছে আমার শরীরে ভালোমন্দের জোয়ার-ভাটা চলছিল সম্প্রতি ভালোই আছি। মংপুতে যাবার পূর্বে একটা কথা ব'লে রাখা ভালো আহার্ষের খরচ সম্প্রতি বেড়ে গেছে। শাকপাতী খাচ্ছিলুম, অবশেষে ডাক্তারের পরামর্শে মাছ-মাংস ধরতে হয়েছে আমার সম্বলের মধ্যে শুনছি তোমার কাছে টাকা দশেক প্রচ্ছন্ন আছে। সেটাতে ক-দিন চলবে জানিয়ো, সেই অনুসারে ওখানকার মেয়াদ স্থির করতে হবে। মাংপবীকেও আমার আশীর্বাদ জানিয়ে

বাবামশায়

১. ভৃত্য ২. ল্যাবরেটরি ৩. মংপুনিবাঁসিনী, প্রীমৈভ্রেয়ী দেবী

নির্বাণ

বাবামশীয় সকলের সঙ্গে হাপিঠাটা করতে খুব ভালোবাসতেন মেয়ে, বউ, পরিবারবর্গের সকলের সঙ্গে১ এমন কি নীলমণি১ ভৃত্যের সঙ্গেও হাম্তা- পরিহাসে তার ছিল সহজ আনন্দ। এই চিঠির মধ্যে তার পরিচয় আছে যথেউ। যখন থেকে তিনি বৈষয়িক ংআব ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন থেকে কোনোদিন তাকে টাক] হাতে রাখতে দেখিনি। যদি কখনো কেউ কিছু প্রণামী দিয়ে যেত তখনি আমাকে ডেকে বলতেন, “তোমার ব্যাঙ্কে এটা জমা রাখো” তার পর মাঝে-মাঝে সেটার হঠাৎ খোঁজ হোত, যেদিন মনে পড়ত। নিজের সম্পর্কে অর্থ-সঙ্গন্ধে কোনো হিনাবনিকাশের ধার ধারতেন না। যা প্রয়োজন ছোটোছেলের মতে। সেটি পেলেই খুশী। টাকাকড়ি বা বিষয়সম্পত্তির সঙ্গে তিনি নিজে কোনো সম্পর্ক রাখেননি। কিন্তু শান্তিনিকেতন অন্যের সম্বন্ধে বৈষয়িক ব্যাপার উপস্থিত হোলে একজন উ*চুদররের বৈষয়িকের মতোই সব বুঝে পরামর্শ দিতেন।

আমি যখন কালিম্পঙে যাই তখন তিনি “ল্যাবরেটরি” গল্পটি লিখতে শুরু করেছেন। কিন্তু আজকাল গল্প

১, কবির ভৃত্য ; রহস্তচ্ছলে কবি ডাকতেন নীলমণি বা লীলমনি, প্রকৃত নাম বনমালী

নির্বাণ

লিখতে ভারি দ্বিধা, বলেন, “আগেকার মতো তাড়াতাড়ি লিখতে পারি না, অনেক সময় নেয়।” তা-ছাড়। তার নিজের লেখা-সন্বন্ধে তিনি খুব কড়া বিচারক ছিলেন, নিখুত না হোলে তীর কিছুতেই মন উঠত না, কতবার যে নিজের হাতে লেখা কপি করতেন, আর সেই সঙ্গে বদল করতেন তার ঠিক নেই, যদিও কপি করবার লোক আপিসে হাজির তবু তাকে দেবেন না। ল্যাবরেটরি* গল্পটি লিখে” পড়তে তার কত সংকোচ লোকে ঠিক বুঝবে কিন! এই ছিল তীর সন্দেহ, সেইজন্য শ্রোতা-সন্বন্ধে তিনি ভারি খুঁতখু' তে ছিলেন। যখন আজকাল তীকে নতুন লেখ পড়তে বলা হোত তিনি ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়তেন এবং আশেপাশের লোকেরাও তাই সেই সঙ্গে তটস্থ হয়ে থাকত। এই রকম ঘটনার একটি ছবি মীরা দেবীর চিঠিতে কিছু পাওয়া যাবে, তাই চিঠির কিয়দংশ তুলে দিচ্ছি। কালিম্পঙে গিয়ে এই চিঠি পাই :.

ভাই বোঠান, আমি এখানে আসার পরদিন দাদা১ কলকাতা গেলেন, ওখান থেকে জমিদারিতে যাবেন। তুমি চলে যাওয়াতে, তার পরে দাদাও গেলেন, তাই বাবার মনটা ক-দিন খুব যাই-যাই করছিল। তার পর

শ্রীরধীজনাথ ঠাকুর

নির্বাণ &

এখন আবার সেটা একটু কেটে গেছে। প্রথমে আরস্ত করলেন যে, চোঁখটা খারাপ হয়েছে, তারজন্য কলকাতায় যেতে হবে৷ তার পরে স্থধাকান্ত১. জিতেনবাবুকেং ডেকে এনে সে-ধাক্কাটা কাটিয়ে দিল।

বর্ধামঙগল হয়ে গেল, বেশ ভালো! হয়েছিল।

বাবা যে-গল্পটাৎ লিখছিলেন সেটা শেষ হয়েছে দু-তিন দিন আগে, জন-কয়েককে পড়ে শুনিয়েছেন। সেদিন সকাল থেকে সে কী একসাইট্মেন্ট বাবার, সকালে স্ুধাকান্তর সঙ্গে একদফা ঠিক হোলে! কাকে-কাকে ডাকা হবে, সেই মতো মহাদেব৪ পাড়ায়-পাড়ায় চিঠি বিলি করে এল, তার পরমুহর্তে , যেই স্ুধাকান্ত নাইতে খেতে বাড়ি গেছে আবার মহাদেব ছুটল স্থুধাকান্তকে ডাকতে স্থধাকাস্ত আসতে আবার কী পরাম্শ হোলো, আবার চিঠি নিয়ে লোক দৌড়ল। সেদিন মহাদেব অনবরত ছুটাছুটি করেছে আর স্থ্ধীব কর বেচারা লেখা কপি করা নিয়ে বকুনি খেয়েছে তেমনি বাবা এমন ইরিটেটেড মেজাজে ছিলেন, পড়! শেষ না-হওয় পর্যস্ত যে-ক'টি আমরা উপস্থিত ছিলুম গল্প পড়ার সময় ভয়ে সব জুজু হয়ে বসে, কারোর মুখে হাসি নেই বাকথা নেই। উপরে গিয়ে চারিদিক তাকিয়ে মনে হোলো যেন আসামীরা কোর্টে হাজির দ্দিতে এসেছে, এখন মনে করতে হাসি পাচ্ছে।

যে-বিষয় নিয়ে এত ভয় সঞ্চার হয়েছিল আসলে গল্পটা কিন্ত সে-রকম ভয়াবহ নয়। গল্পটা আরো এন্জয় করা যেত যদি গল্প

১. গ্রীনুধাকান্ত রায় চৌধুরী ২. ডাঃ গ্রাজিতেন্্রনাথ চক্রবর্তী ও, জ্যাবরেটরি ৪. ভৃত্য

নির্বাণ পড়ার ভূমিকাটা তা্যায়ী হোত। আমি যেখানে বসেছিলুম সেখান থেকে অনিলবাবুর৯ চেহারাটা আমার চোখের লামনে ছিল, কাজে-কাজেই গল্প শুনতে-শুনতে সেদিকে আপনি চোখ পড়ছিল, আমি একটু অর্তিরঞ্িত করে বলছি না, অনিলবাবু এমন মুখ কালি করে একটা হাতে ঠেস দিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে বসেছিলেন যে, সেদিকে তাকিয়ে মনে হোতে পারত যে, বিচারক বোধ হয় কারোর প্রাণদণ্ডের বায় পড়ে শোনাচ্ছেন, তাই শ্রোতাদের মুখে এই বেদনান্চক ভাব। ন্ুধাকাস্ত ইচ্ছে ক'রে ঘরের বাইরে এমন জায়গায় বসেছিল যেখান থেকে তাকে ন! দেখতে পাওয়া যাঁয় কাজেই তার চোখ-মুখের বর্ণনা! দিতে পারলুম না। আর স্বঘীর কর বেচারী বাবাব চৌকির পিছনে এমন জায়গায় লুকিয়ে ছিলেন যে, ভদ্রলোক সে-ঘরে আছেন ব'লে জানা যেত না, যদি না মাঝেমাঝে তাঁকে কাঠগড়ার আপামীর «মতো! কাগজপত্র এগিয়ে দিতে খাড়া না হোতে হোত। গল্পটি হচ্ছে বর্তমান যুগের মেয়েদের নিয়ে *** ইতি।

মীরা

বাঁবামশায় পাহাড় পছন্দ করতেন না, নদীর ধারই তীর ছিল প্রিয়, বলতেন, নদীর একটি বিস্তীর্ণ গতিশীলতা আছে, পাহাড়ের আবদ্ধ সীমার মধ্যে মনকে সংকীর্ণ ক'রে রাখে, তাই পাহাড়ে বেশিদিন থাকতে ভালে! লাগে না। বহুকাল আগে রামগড়ে

১, প্রীঅনিলকুমার চন্দ

নির্বাণ

তিনি একটি শৈলাবাস তরি করেন। সেখানকার বাঁড়ির নাম দিয়েছিলেন হৈমন্তী--ভার “হৈমন্তী” গল্প পাহাড়ের বাড়িতে লেখা। তিনি,নব-সময় একটি কল্পিত বাসভবন মনে-মনে গড়ে তুলতেন, তার সঙ্গে বাস্তব-জগতের মিল হোত না কোনোদিন, তখন তিনি আবার গড়তেন নতুন বাসার কল্পনা এইভাবে নতুন-নতুন বাড়ি তৈরি করে তোলাও তাঁর একটা শখ ছিল। এই রকমের কল্পিত বাসভবন বা! স্টুডিয়োরুমের কথা৷ একসময় তার মনোলোকে যে-ছবি সৃষ্টি করত তারি ছায়া নিন্ের চিঠিখানিতে পাওয়া যাবে। তিনি ১৯৩০ সনে জর্মানি ভ্রমণ করেছিলেন, সেই সময় আমাকে চিঠিটা লেখা, আমরা তখন লগুনে :

গড

কল্যাণীয়াহ্ু

বৌমা? বৃষ্টি, বৃষ্টি, ৃষ্টি_দিনের পর দিন। সবাই বলছে এমন কাণ্ড হয় না কখনো আমি মনে-মনে ভাবছি,-এট1 আমারি কীতি। আমি বর্ষার কবি। শ্রাবণ মাসে বর্ধামঙ্গল আমার পিছনে-পিছনে সমুদ্র পার হয়ে এসে হাজির কিন্ত সত্যি কথা বলতেই হবে, "হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে*, কবিতাটি ঠিক খাটছে না। হৃদয় নাচছে না, দমে আছে যাকগে--আগামী মঙ্গলবার.ষাঁব জেনিভায়। সেখানে আর-এক পালা। শুনছি

নির্বাণ

আয়োজন করেছে খুব বড়ো রকমের আদর অভার্থনার অভাব হবে না।

এখানকার গ্যাশন্তাল গ্যালারিতে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে, শুনেছ। তার মানে, তা'রা পৌছবে অমরাবতীতে। ওর! দামের জন্য ভাবছিল, টাকা নেই কী করবে আমি লিখে দিয়েছি যে, আমি জর্মানিকে দান করলুম, দাম চাইনে। ভাবি খুশী হয়েছে। আরো অনেক-অনেক জায়গাঁ থেকে একজিবিশনের জন্যে আবেদন আসছে একটা এসেছে স্পেন থেকে, তারা চায় নভেম্বরে ভিয়েনা চায় ইত্যাদি ইত্যাদি আমি যে পোটো সেই নামটাই ছড়িয়ে পড়ছে কবি নাকে ছাড়িয়ে। থেকে-থেকে সনে আসছে তোমার সেই স্ট,ডিয়োর কথাটা মগ্ুরাক্ষী নদীর ধারে, শালবনের ছায়ায়-_খোলা জানলার কাছে। বাইরে একটা তালগাছ খাড়া দাঁড়িয়ে, তারি পাতাগুলোর কম্পমান ছায়৷ সঙ্গে নিয়ে রোদ্দ,র এসে পড়েছে দুপুরবেলা, নদীর ধার দিয়ে একটা ছায়াবীথি চলে গেছে, কুড়চি ফুলে ছেয়ে গেছে গাছ, বাতাবি নেবুর ফুলের গঞ্ধে বাতাস ঘন হয়ে উঠেছে, জারুল পলাশ মাঁদারে চলেছে প্রতিযোগিতা, সজনে ফুলের ঝুরি ছুলছে হাওয়ায়, অআশথগাছের পাতাগুলো ঝিলমিল করছে--আমার জানলার কাছ পর্যস্ত উঠেছে চামেলি লতা নদীতে নেবেছে একটি ছোটে? ঘাট লাল পাথরে বাঁধানো, তারি এক পাশে একটি ঠাপার গাছ একটার বেশি ঘর নেই। শোবার খটি দেয়ালের গহ্বরের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাঁয়। ঘরে একটিমান্জ আছে আবাম-কেদারা, মেঝেতে ঘন লাল রঙের জাজিম পাতা, দেয়াল বাসস্তী রঙ্ডের, তাতে ঘোর কালো রেখার পাড় আ্বাকা। ঘবের গুবদিকে একটুখানি বারান্দা, হুর্ধোদয়ের আগেই সেইখানে চুপ

নির্বাণ করে গিয়ে বসব, আর খাবার সম্ত্রয় হোলে লীলমনি সেইখানে খাবার এনে দেবে একজন কেউ থাকবে যার গলা খুব মিষ্ট, যে আপন মনে গান গাইতে ভালোবাসে পাশের কুটীরে তার বাসা, যখন খুশি সে গান করবে, আমার ঘরের থেকে শুনতে পাব। তার স্বামী ভালোমাহুষ এবং বুদ্ধিমান, আমার চিঠিপত্র লিখে দেয়, অবকাশ- কালে সাহিত্য-আলোচনা করে এবং ঠাট্টা করলে ঠাট্টা বুঝতে পারে এবং যথোচিত হাসে নদীর উপরে দুটি সাঁকো থাকবে, নাম দিতে পারব জোড়াসাকো-_সেই সীকোর ছুই প্রাস্ত বেয়ে জু'ই, বেল, রজনীগন্ধা, রক্তকরবী নদীর মাঝেমাঝে গভীর জল, সেইখানে সবে রাজহাস 'আর ঢালু নদ্ীতটে চ"রে বেড়াচ্ছে আমার পাটল রঙের গাই-গোরু তার বাছুর নিয়ে। শাকসবজির খেত আছে, বিঘে দুইয়ের জমিতে ধানও কিছু হয়। খাঁওয়াদাওয়! নিরামিষ, ঘরে তোলা মাখন দই ছানা ক্ষীর, কুকারে যা রীধা ষেতে পারে তাই যথেষ্ট-_রান্নাঘর নেই থাক্‌ এই পর্যস্ত। বাইরের দিকে চেয়ে মনে পড়ছে আছি বলিনে-_-বড়োলোক সেজে বড়ো কথ! বলতে হবে-_ বড়ো খ্যাতির বোঝা বয়ে চলতে হবে দিনের পর দিন জগৎজোড়া সব সমস্যা রয়েছে * তর্জনী তুলে, তার জবাব চাই। ওদিকে ভারতসাগরতীরে অপেক্ষ১ করে আছে বিশ্বভারতী-_তার অনেক দাবি, অনেক দায়--ভিক্ষা করতে হবে দেশে দেশাস্তরে অতএব থাক আমার স্ট,ডিয়ো। কতদিনই বা বাঁচব, ইতিমধ্যে কণ্তব্য করতে-করতে ঘোরা যাক, রেলে চড়ে, মোটরে চশ্ড়ে, জাহাজে চড়ে, ব্যোমযানে চসড়ে, সভ্যভব্য হয়ে অতএব আর সময় নেই। ইতি ১৮ই অগস্ট, ১৯৩০

১. স্পুনশ্চ” কাব্যগ্রন্থের “বাসা” কবিতাটি এই চিঠিখানারই রূপাস্তর |

৯. নির্বাথ

তার কল্পনা ছিল রামগড়ের জমিতে অরচার্ডের বাগান করাবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল, এত দূরের রাস্ত। ঘন ঘন যাতায়াত পোষাত না।

এদিকে আমি কালিম্পঙে পাহাড়ে পৌছবার তিন সপ্তাহ পরে টেলিফোনে খবর এল, বাবামশায় কাল কালিম্পঙ এসে পৌছবেন। বৃষ্টির পাল সবে শেষ হয়েছে, শরকালের আভা জেগে উঠেছে আকাশে বাতাসে মনে-মনে খুশী হলুম যে, বাবামশায় মংপু না! গিয়ে এখানে আসছেন। গৌরীপুর-লজের যে-সব ঘরগুলিতে থাকতেন সেগুলি তাঁর মনের মতে। যেমন ক'রে গোছানো হোত তেমনি ক'রে সাজাতে শুরু ক'রে দিলুম তখন পাহাড়ে নান! জাতের ফুল ফুটছে, তার মধ্যে হলদে দৌলনটাপাই প্রধান উল্লেখযোগ্য তারি গন্ধে বাগান থাকত মেতে। সেখানে সকালে উঠে ফুল-সাজানো ছিল একটি বিশেষ কাজ, একজন ইংরেজ মহিল! আমার সঙ্গে স্বোর ছিলেন, তিনি এ-কাজটি হ্চারুরূপে করতেন। আজ বাবামশায় আসবেন বলে বিশেষভাবে ঘরেতে ফুল-সাজানোয় ব্যস্ত ছিলুম। পুষ্প ধৃপের গন্ধে ঘরগুলি অনাগত অতিথির প্রত্যাশার আভাসে পূর্ণ হয়ে উঠল। তাঁর বিশ্রীমণগূহটি যখন পারিপাট্যের পরিচ্ছন্নতায় আরামের বিশিউ রূপ

নির্ধাণ ১১ নিল তখন আমরা প্রতীক্ষা কুরে রইলুম আমাদের পুঁজনীয় অতিথির

উৎসুক হয়ে দাড়িয়ে আছি, *এমন সময় শুনি হর্ন বাজাতে-বাজাতে প্রকাণ্ড মোটরটা পাহাড়ের সরু রাস্তা বেয়ে নেমে আসছে। গাড়ি এসে দরজায় দাড়াল ;) আমর। এগিয়ে গেলুম, হ্ধাকান্ত দেখলুম আগেই নেমে পড়েছে তার পর বাবামশায়কে হাত ধরে নামিয়ে নিলে 1 এবার তীকে খুব অস্থস্থ দেখাচ্ছিল। তীকে ঘরে নিয়ে আসা হোলো, চৌকিতে বসলেন, আমরা সকলেই খানিকক্ষণ চুপ করে রইলুম। বাবামশায় নিস্তবতা ভঙ্গ করে বললেন, «বৌমা, মৈত্রেয়ী লিখেছিল ওর ওখানে যেতে কিন্ত সেখানে যেতে সাহস হোলো না, আমি এখানেই এলুম ডাক্তাররা বলছেন আমার কখন্‌ কী হয় তাই তোমাদের কাছাকাছি থাকাই ভালো আমাকে এবার বড়ো ক্লান্ত করেছে, ভিতরে-ভিতরে, ছুর্বল বোধ করছি, মনে হচ্ছে যেন সামনে একটা! বিপদ অপেক্ষা করে আছে ।” এমন সময় বনমালী তার স্নানের খবর দিয়ে গেল তাই তখনকার মতে কথাবার্তা ভঙ্গ করে সকলে উঠে পড়লেন। আমি হুধাকান্তকে একলা পেয়ে বললুম, “তুমি কোন্‌ সাহসে এই পাহাড়ে-রাস্তায় বাবামশায়কে নিয়ে এলে, দরকার

১২ নির্বাণ

হোলে আমাকে লিখলে আমি না হয় চলে যেতুম।” ইদানীং আমি কিংবা! আমার স্বামী কাছে না থাকলে উনি ভারি বিচলিত হতেন।, স্থধাকান্ত বললে, “বৌদি, উপায় কী আছে, উনি জেদ ধরলেন এখানে আসবেন, কিছুতেই ছাড়লেন না, থামাবার অনেক চেষ্টা কর! হয়েছিল, এমন কি ডাঃ রায়, স্থদ্ধ বললেন, “আপনার শহরের কাছ থেকে দুরে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে ডাক্তার সহজে পাওয়া যায় এমন জায়গার কাছাকাছি আপনার থাক দরকার, এই শুনে গুরুদেব বললেন, আচ্ছা মংপু যাব না কিন্ত কালিম্পঙে যেতে তো বাধা, নেই, সেটা তো৷ আর গতিবিধির বাইরে নয়। তার এখানে আসবার এত বেশি আগ্রহ দেখে আমর] বাঁধা দিতে সাহম করিনি ।”

আমার স্বামী এই সময় জমিদারি পরিদর্শনের জন্য পতিসরে গিয়েছিলেন তিনিই একমাত্র লোক ধিনি বাবামশায়কে নিবৃত্ত করতে পারতেন। ইদানীং যদি তার কোনো একটা ঝোক চাপত কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে তিনি হয়তো! উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন তখন আর কারুর কথায় কান দিতেন না, কেবল আমার স্বামী এসে যদি বোঝাতেন তখনি শিষ$ ছেলের মতো ঠাণ্ডা হয়ে

১. ডীঃ গ্রবিধানচন্ত্র রায়

নির্বাণ ১৩

যেতেন। এটা ছিল পরিজনবর্গের একটি আমোদের বিষয় তবে সেই কৌতুকটি সকলে মিলে উপভোগ করতেন নেপথ্যে গুরুদেবের সামনে যথ্যেপযুক্ত গা্তীর্য সকলেই রক্ষা করে চলতেন তা৷ বলাই বাহুল্য

সেদিন বিশ্রামের পর, পরের দিন সকালে বাবা- মশায়ের চেহারা “বেশ স্স্থ তাজা দেখাচ্ছিল। আজকাল ডাক্তারের পরামর্শে আবার মাছমাংম ধরেছেন, কলকাতায় অমিতা১ নাতবৌয়ের হাতের মাংস-রান্না অনেক দির্ন পরে মুখে ভালো লেগেছিল, বার-বার বললেন, __তাই পাঁঠার মাংসের ঝোল সেদিন রান্না হোলো খাবার সময় আমাদের সরুলকে সামনে বক্সে গল্প করতে হোত, স্থধাকান্তও এই সময় খুব গল্প জমাত। সে বললে, “আজ বৌদি পাঁঠার মাংস রেঁধেছেন, খেয়ে দেখুন 1৮ তিনি হেসে বললেন, “নাতবৌয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া শক্ত হবে।” কিন্তু মাংসের ঝোল শেষে বেশ সবটুকুই খেলেন। সুস্থ অবস্থায় বাবামশায় কখনো! এক রান্না ছদিনের বেশি খেতেন না, নিত্য নতুন রান্না হোলে তিনি ভারি খুশী হতেন, তাছাড়া নিজেও নান! প্রকারের রম্ধন-তালিক1] আমাদের বলতেন, সেই তালিক। অনুসারে

১. প্রীঅমিত। ঠাকুর

১৪ নির্বাণ

রাম্না উত্তরে গেলে তীর ম্ষতি হোত। অনেক সময় হেসে বলতেন, «বৌমা, তোমার শাশুড়ীকে আমি কত রান্নার মেনু জোগাতুম, আমি অনেক রান্না তাকে শিথিয়েছিলুম, তোমর! বিশ্বাস করবে না জানি।* বাড়ির আরো ছ-একজন মেয়ে ফার। উপস্থিত থাকতেন তার! মজা ক'রে বলতেন, “তিনিও তো খুব ভালো রীধিয়ে ছিলেন, আমরা শুনেছি ।” বাবামশায় হেসে বলতেন, “তা ছিলেন, নইলে আমার মেনুগুলো এত উত্রত কী ক'রে।”

যাই হোক, এখন আবার মাছ-মাংস খাচ্ছেন দেখে ভালো লাগল, কেননা) খাওয়। নিয়ে নানারগ পরখ করা ছিল ওঁর চিরকালের বাতিক, সেটা যখনি বেশি বাড়াবাড়ি মাত্রায় হোত তখনি দেখেছি শরীর অন্থস্থ হয়ে পড়ত। আসলে মন থেকে তাঁর ইচ্ছে হোত নিরামিষ-আহারী হোতে কিন্তু নিরামিষ খাওয়া ভার অভিমত হোলেও, আমিষ খেলে থাকতেন ভালে! তার আহার সম্বন্ধে নিজেই আমাকে একবার একটি তালিকা লিখে পাঠিয়েছিলেন, আমি বোধ হয় তখন বোটে কলকাতায় ছিলুম :

নির্বাণ ১৫

কল্যানীয়াস্থ,

বৌমা, তোমার কাছে নালিশ করবার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছিনে। নালিশ করবার বিষয় অত্যন্ত কমে গিয়েছে ভোরে তিনটের সময় উঠে নান করি, মাথায় গায়ে সরযে-বীটা মেখে। আলো যখন হয় চায়ের সরঞ্জাম আসে-_মস্ত এক ভালা মাখন খাই চিনি সহযোগে চীনে চায়ের সঙ্গে থাকে ছ-তোঁস রুটি--_টেবিলে যোগ দেয় স্থধাকাস্ত এবং সেক্রেটারি,১ তাঁদের জন্তে রুটি ছাড়া থাকে স্ীনন্দা২ কোম্পানির রচিত মিষ্টান্শ__সেটাতে আমার অতিথিদের যথেষ্ট উৎসাহ দেখতে পাইনে,__নিশ্চয় সকালে তাদের যথেষ্ট থিদে থাকে না বেলা সাঁড়ে দশটার সময় আমার মাধ্যভোজন- একেবারে বিশুদ্ধ হবিষ্ান্ন আতপ চালের সফেন ভাত, আলুসিদ্ধ, কচুসিত্ব, কোনো- কোনো দিন অতি সভয়ে খেয়ে থাকি তোমারই বাঁগানে উৎপন্ন ওল- সিদ্ধ | সঙ্গে থাকে এক পাইন্ট ঘোল। তিনটের সময় বাগানের আতা এবং আঙুরের রস। ছণ্টার সময় ভূষি সমেত আটার ছুই খণ্ড রুটি, সিদ্ধ আলু ভাঙা সংযোগে, এক পেয়ালা দুধে কিঞ্চিৎ ফলের রস মিশিয়ে। এর অতিবিক্ত যাঁকিছু আসে সে আসে ঠাকুরের নৈবেগ্যরূপে, ঠাকুরের প্রসাদরূপে সে যায় অন্যের ভোগে।

কাতিক মাসের আরম্ভ থেকে ক্রমশই ঠাণ্ডা পড়ছে, কাল পরশ মেঘ করে ছিল, বুষি ফাকি দিয়েই অন্তর্ধান করেছে--আজ মিগ্ক হাওয়া! দিচ্ছে দুঙিক্ষের আশঙ্ক! চারিদিকেই, কিন্তু গরমের প্রতাপ

১. প্রীঅনিলকুমার চন্দ ২. প্রীযুনন্দ৷ দেবী

১৬ নির্বাণ

আর টেকে না। লুডি জামার উপর একখানা টিলে কাপড় চড়িয়েছি তুমি কবে এসে আমাদের ভার গ্রহণ করবে সেজন্যে তাকিয়ে আছি। ইতি ২২ অক্টোবর, ১৯৩৫ বাবামশায় আজকাল বিকেলে চায়ের পর গৌরীপুর-ভবনের লম্ব! বারাগ্ডায় আমার হাত ধরে বেড়ান, বলেন,«বৌমা, আমার একটু বেড়ানো দরকার, বসে থেকে-থেকে আমার পা-গুলো৷ অসাড় হয়ে আসছে ।৮” আমি ভাবছি, মাত্র এক সপ্তাহ এসেছেন, এখনি এতটা যখন ভালে! বোধ করছেন, তাহলে বোধ হয় ঠাণ্ডাতে ভাঁলোই থাকবেন। সমস্ত দিন লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, বিকেলে চায়ের পর সকলের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন, কালিম্পঙে পৌঁছবার ছুদিন পরে স্থধাকান্তকে ডেকে বললেন, “তুই যা শান্তিনিকেতনে, তোর ছেলের অস্থখ করেছে, তার কাছে তোর থাকা দরকার, এখানে আলু এক] থারেলেই ফাই-ফরমাশের কাজ বেশ চলে যাবে অমিয়কেও১ আমতে লিখে দেব, সে যদি আসতে পারে তো বেশ হবে। এদিকে মৈত্রেয়ীরও আসবার কথ! আছে।” বাবামশায়ের আদেশ অনুসারে হধাকাস্ত অনিচ্ছাসত্বেও তার পরদিন চলে গেল। ১, ডাঃ প্রীঅমিয় চক্রবর্তী

নির্ধাণ ১৭

এদিকে আবহাওয়! বদলে গেছে, বর্ধার শেষ রেশটুকুও এখন আর মেঘেতে নেই, আকাশে বাতাসে ঝলমল করছে উজ্জ্বলতা, ঘন নীলাম্বরী গ%ন খুলে পৃথিবী হালকা হাওয়ার শাড়ি পরেছে তিববত থেকে বইছে শীতের পূর্বদূতী ঈষৎ শিরশিরে হাওয়া দিনগুলো! ভরে ছিল আলোবাতাসের উৎমব। বাবামশায় আক পুরে পান করছেন তার আনন্দ!

২৫ সেপ্টেম্বর সকালে উঠে দেখলুম, সমস্ত

জানালাদরজ! খুলে দিয়ে বসে আছেন, একটু দূরে বনমালী চায়ের আয়োজন করছে, দূরে উদয়াচলের খোল। দ্বার দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধবল শিখরের উদার খু দেহ, সেই অসীম স্তবতার আব্রণ ভেদ ক'রে বাতায়নপথে ধ্যাননতলোচন কবির শুভ্র কেশ কপালের উপর এসে পড়েছে শঙ্করের প্রথম আলোক-আশিস, আর গায়ের উপর দিয়ে বইছে নবপ্রভাতের বিশ্বব্যাপী মধুর স্পর্শ নিচের বাগানে লেগেছে নান৷ রঙে গন্ধে মিলে লতাপাতার হুল্লোড়, কবির প্রাণ আর তাদের প্রাণ আজ এক হয়ে গেছে।

আমি বনমালীকে ডেকে আন্তে-আস্তে বললুম, “এত সকালে ঠাণ্ডায় জানাল। খুলে দিয়েছিস, করেছিস কী, ঠাণ্ডা! লাগবে যে ।% বনমালী বললে, “বাবামশায়ের হুকুম, না খুললে রাগ করবেন।”

১৮ নির্বাণ

যখন চা খাবার জন্যে উঠে এলেন, বললুম,“বাবামশায়,

নৃতন ঠাণ্ডা, এখানে আপনি একটা! গরম জোবব৷ পরুন, কেবলমাত্র আলোয়ান এখানকার পক্ষে যথেষ্ট নয়।» বাবামশায় হেসে বললেন, “তোমরা বড়ো! শীতকাতুরে, কি আবার ঠাণ্ডা।৮ তার পর চা খাওয়া শেষ করে লেখবার ঘরে গিয়ে বসলেন, লিখলেন

পাহাড়ের নীল আর দিগন্তের নীলে

শূন্যে আর ধরাতলে মন্ত্র বাধে ছন্দে আর মিলে

বনেরে করায় স্নান শরতের বৌন্দ্ের সোনালি

হল্দে ফুলের গুচ্ছে মধু খোঁজে বেগুনী মৌমাছি,

মাঝখানে আমি আছি,

চৌদিকে আকাশ তাই দিতেছে নিঃশব্দে 'করতালি।

আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ,

জানে তা কি কালিম্পঙ ॥- জন্মদিনে, ১৪

এতদিন তার দেহমন দিয়ে যা! শোষণ করেছিলেন আজ

তার ছন্দে তাই দিলেন ঢেলে আলে আর্‌ রঙের মধ্যে তিনি একদিন সত্যিই একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ যেন কিছুদিনের নিয়ত অবসন্নতা সব ভূলে গিয়ে তার মন আলোর আনন্দধারায় ম্নান করছিল। তখন কে জানত এই পাঁচটা দিনই তীর দেহমনের স্বাস্থ্য-সৌন্দর্য উপভোগের শেষ কয়দিন, এরি পিছনে আকীর্ণ ক'রে আছে

নির্বাণ ১৯

অন্ধকার রাতের সংকল্প অনেকদিনের ক্লান্তিভরা বিষণ ছায়া অপসারণ ক'রে যেন হঠাৎ উদ্দীপ্ত হোলো একটি আবেগময় প্রাণের আনন্দ মুহূর্ত, তারি শিহরনে গাইলেন :

আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রও

২৪ সেপ্টেম্বরেও কালিম্পঙে যে কবিতা লিখেছেন তার থেকে বোঝা যায় সুমন্ত বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মিলে তিনি সময়ে একটি ধ্বনি ভঙ্গীর আনন্দলোকে বিচরণ করছিলেন :

উদ্দাম হইয়া উঠে শুধু ধ্বনি শুধু ভঙ্গী তার।

মনে মনে দেখিতেছি সার! বেল! ধরি,

দলে দলে শব ছোটে অর্থ ছিন্ন করি,

আকাশে আকাশে যেন বাজে

আগ্ড়ুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে জন্মদিনে, ২০

তার জীবনের বিষাদ্ুপুর্ণ অধ্যায় শুরু হবার কয়েক- দিন আগে তিনি যে চিম্ময়লোকে বাস করছিলেন তার সেই অনুসভূভি এই ক'দিনের লেখার মধ্যে বাঁধা পড়েছে সমস্ত ্জনীশক্তি যেন শেষ উদ্দামতায় উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল, তাই ধ্বনি ভঙ্গীগুলে! তার মানস-আকাশে সৃষ্টির আকাঙ্ষায় পাখা মেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যাকে

২০ নির্বাণ

কোনো নাম দেওয়া যায় না, তাকেই তিনি বলেছেন, “আগডুম বাগৃডুম ঘোড়াডূম সাজে ।”

২৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ছুটোর সময় অমিয়বাবুকে নিমন্ত্রণ ক'রে এক চিঠি লিখলেন, চিঠি শেষ ক'রে আমাকে ডেকে বললেন, “অমিয়কে এখানে আদতে, লিখলুম বৌমা তুমি কত্রা, তোমার মতটা ' নেওয়া দরকার ।” তিনি প্রায় মজা ক'রে আমাকে এই রকম বলতেন যদিও তিনি জানতেন তীর ইচ্ছাই সব, তবু আমার প্রতি এই স্েহের সম্মান-দান তার মতো শিল্পীর সুক্মম মনের প্রীতিপুর্ণ পরিচয় বলেই জানতুম আমি হেসে বললুম, “বেশ হবে, অমিয়বাবু এলে আপনার ভালো লাগবে ।” বাবামশায় সায় পেয়ে ভারি আনন্দিত হলেন। সেদিন বিকেলে বললেন, “আজ সকালে খাওয়া গুরুপাক হয়েছে, বেশি কিছু বিকেলে খাব না।” অতি অল্পই খেলেন। আজকাল খাওয়া-সম্বন্ধে বাবামশায়কে খুব সাবধানে থাকতে হয়। এমন সময় মংপু থেকে চিঠি এল, কাল সকালে মৈত্রেয়ী গৌরীপুর-ভবনে পৌছবেন। বাবামশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন, সন্ধ্যার সময় বললেন, “তাই তো৷ মাংপবী আসছে, আর, আজ শরীরট৷ খারাপ হোলো, আজ রাতে ওষুধটা1 বৌম! খাব, তাহলে কাল

নির্বাণ ২১

শরীর ঠিক হয়ে যাবে ।” তীর পা ফুলত ব'লে ডাক্তার বলেছিলেন, মালিশ দরকার, তাই শোবার আগে তেল দিয়ে মালিশ করে দেওয়া হোত। রেদিন রাত নটার সময় সোফার উপর শুয়েছেন, আমি পায়ে মালিশ করে দিলুম ; ঘর অন্ধকার ছিল, বুঝলুম তাঁর তন্দ্রার মতো! এসেছে, তাই অতি সন্তর্পণে উঠলুয যাতে তার তন্দ্রা না ভাঙে। কিন্ত ওঠার শব্দেই বোধ হয় সে-ঘুমটুকু কেটে গেল। আমাকে ডেকে বললেন, “বৌমা, আমি এইবার শুতে যাই, তুমি বায়োকেমিক ওষুধগুলো রাতের মতো! আমার টেবিলে রেখে যেয়ো ।” তিনি শুয়ে পড়লেন আমি ওষুধ আদেশমতো টেবিলে রেখে মশারি গুজে চলে এলুম। আমার শোবার ঘর বারাগ্ার অপর প্রান্তে, বেশি দূর নয়, বনমালীকে বলে এলুম, *“বাবামশায় যদি রাতে ওঠেন, আমাকে ডাকিস।” বনমালী শুত তার শোবার ঘরের দরজায়। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল কিসের শব্দে জানি না, বুঝলুম, বনমালী উঠেছে, বাবামশায়ের শোবার ঘরে আলো জ্বলছে সেদিন ২৬ সেপ্টেম্বর আমি উঠে বনমালীকে জিজ্ঞাসা করলুম, “কী রে, বাবামশায় কেমন আছেন” বনমালী বললে, «না, বৌমা, ভালো৷ ঠেকছে না, আপনি জিজ্ঞাস! করুন ঘরের মধ্যে এসে ।”

২২ নির্বাণ

ঘরের ভিতর ঢুকে দেখলুম, বাঁবামশায় ইজিচেয়ারে বসে আছেন, সামনে কয়েকটা ওষুধের শিশি নিয়ে। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা,করতে বললেন, “বৌমা, ভালো না» এই ঝলে তিনি আরেকটা বায়োকেমিক ওষুধ খেয়ে বিছানায় শুলেন। সকালে রোদ এসে পাছে বিশ্রামের ব্যাঘাত করে তাই পরদাগুলে! টেনে দিয়ে, পাশের ঘরে অপেক্ষা করে রইলুম। এদিকে দেখি বেলা সাতটা আন্দাজ বাবামশায় ধীরে-ধীরে লেখবার ঘরে এসে বসলেন হাতে কবিতার খাতা, বুঝলুম এখন একটু ভালো আছেন, পায়ের উপর মোটা কণ্ঘল ঢাকা দিয়ে দিলুম। কবিতার খাতা নিয়ে লিখতে লাগলেন, এই সময় এক পেয়াল৷ গরম কফিও খেলেন। আমি বললুম, “একবার: ডাক্তারকে ডাকাই |” ডাকবার অনুমতি দিলেন। অন্য সময় হোলে ডাক্তার একেবারেই পছন্দ করতেন না, আজ আর কোনে আপত্তি করলেন না।,

দেখতে-দেখতে ঘড়িতে ন'টা, ডাক্তার গোপালবাবু, এলেন। দেখে শুনে বললেন, “ও কিছু নয়, একটু. ওষুধ খেলেই কমে যাবে, হজমের গোলমাল মাত্র |” ডাক্তারবাবু চলে গেলেন। এদিকে দেখি হর্ন বাজিয়ে মংপুর গাড়ি

১, ডাঃ প্রীগোপালচন্ত্র দাশগুণত

নির্বাণ ২৩

এসে থামল, মৈত্রেয়ী দেবী তার শিশু মেয়েকে নিয়ে পৌঁছেছেন। বাবামশায় তাঁদের দেখে কত খুশী, মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের অন্তস্থ ভাব, যেন মিলিয়ে গেল। মৈত্রেয়ীকে এরি মধ্যে কাছে বসিয়ে তিন চারটি কবিত! পড়ে শোনালেন আর তার নূতন লেখ গল্প ল্যাবরেটরির পাণুলিপি গুর হাতৈ দিয়ে বললেন, “বড়োই ইচ্ছে ছিল গল্পটা তোমাদের পড়ে শোনাব, কৌমাও শুনতে চেয়েছিলেন কিন্তু সে আর আমার দ্বারা হোলো না, পড়ে নিয়ো ।” আমরা বললুম “কেন, আপনি হ্থস্থ হয়ে কাল আমাদের শোনাবেন।” তিনি উদ্দাসীনভাবে বললেন, «সে এখন কবে হবে ।” এই সময় ওষুধ এসে পৌঁছল, তাকে এক দাগ ঢেলে দিলুম, তিনি খেয়ে খাটে গিয়ে গুলেন। পাশের ঘরে ঘেত্রেয়ী দেবীদের খাবার প্ররস্তত, সকলেই দুপুরের আহারের জন্য চলে গেলেন। অল্লক্ষণ পরেই কানাইয়ের১ অস্ফুট চীৎকারে আমি মৈত্রেয়ী ছুজনেই ঘরের ভিতর ছুটে এলুম, এসে দেখি বাবামশায়ের মুখ লাল, আর, চেতনা যেন আচ্ছন্ন হয়ে ' আসছে, আমাকে মৈত্রেয়ীকে কাউকেই চিনতে পারছেন না। আমি তে। চমকে গেলুম, বুঝলুম অস্থখটা সহজ নয়, তখনি গাড়ি

১, বালকত্‌ত্য

২৪ নির্বাণ

পাঠালুম ডাক্তার আনতে আবার ডাক্তার এলেন কিন্তু তিনিও বোধ হয় তখন আমাদের চেয়ে খুব বেশি কিছু বুঝলেন কিন! জানি ন1, সন্ধ্যার সময় এখানকার হাস- পাতালের ডাক্তারকে নিয়ে আবার আসবেন ব'লে গেলেন। এদিকে সময় কাটছে একই ভাবে, কখনো! একটু ভালো, কখনে! একটু মন্দ; ন্ধ্যার পর যেন ভালোই মনে হোলে ছু-চারটে কথাও বলছেন, আমাদের চিনতেও পারলেন। হাসপাতালের ডাক্তার নিয়ে গোপালবাবু এলেন, এবার দুজনে ভালে৷ করে পরীক্ষা করে বললেন, “এ তে। কীডনির অস্থখ চলছে, যাকে বলে যুরেমিয় 1৮ সে রাত্রের মতো! তার! বললেন গ্র,কোস 8 ডাবের জল খাওয়াতে, সকালে এসে রুগী দেখে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবেন। নুতন ডাক্তারটিকে বাবামশায়ের পছন্দ হয়েছিল, মৈত্রেয়ীর দিকে চেয়ে বললেন, “ডাক্তার মানুষ ভালো ।”

কথায় বলে যাকে রাখো সেই রাখে, শীতের দেশে তখন আর ডাব কোথা থেকে আসবে, তবে মনে পড়ে গেল বাবামশায়েরই সঙ্গে সপ্তাহ খানিক আগে নিচের থেকে ছুটি ডাব এসেছিল, সেই ছুটি ডাব এই অসময় রাত্রিতে সেদিন খুব কাজ দিল। রাত্রে ঘুম ভালো হয়নি,

নির্বাণ ২৫

কখনো শুয়েছেন কখনো বসেছেন, তবে চেতনার দিক থেকে তত আচ্ছন্ন নন, সকলকেই চিনতে পারছেন। ভোরের বেলায় একটু হলিঝ্স তৈরি রূরে দিলুম, খেলেন; মৈত্রেয়ীর সঙ্গে ছ-একটা তামাশা! করে কথাও বললেন, আমাকে বললেন, “বৌমা, তোমাদের বড়ে৷ কষ্ট দিচ্ছি, এই

মাংপবীকে খাটিয়ে নাও ।»

ভাবলুম সকালে যখন ভালো তখন চি আজ রোগের উপশম হবে বেলা বাড়বার আগেই বোলপুরে টেলিফোনে খবর দেবার জন্যে আলুকে আমাদের প্রতিবেশীর বাড়ি পাঠিয়ে দিলুম। তাদের ওখানে টেলিফোন থাকায় খুব স্থবিধে হয়েছিল। আলু ফিরে এসে খবর দিলে, অনিলবাবু ফোন ধরেছিলেন, আমি বলেছি গুরুদেবের শরীর অত্যন্ত খারাপ, তারা যেন কেউ- নাকেউ আসেন। , অনিলবাবু বললেন, তারা আজই আসবার ব্যবস্থা করবেন] এদিকে গোপালবাবু সকালে যথাসময়ে এলেন কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তারসাহেবের দেখা নেই। খবর নিয়ে বোঝ! গেল সাজিক্যাল কেস হাতে নিতে তিনি বড়ো ইস নন, বোধ হয় ভয় পেয়েছিলেন -

১, সচ্চিদানন্ন রায় নি

২৬ নির্বাণ

দুপুরে বারোটার মধ্যে দেখা গেল আবার বাবামশায় অচেতন হয়ে আসছেন, মৈত্রেয়ী এ-দময় থাকাতে বড়োই স্ববিধ! সাহায্য হুয়েছিল। তিনি যে বাবামশায়কে কতদূর ভালোবাসেন ভক্তি করেন তা আমি এ-ছুদিনে খুবই বুঝতে পেরেছিলুম আজকের অবস্থা দেখে আমার মনট। যেন সাত হাত জলের 'নিচে নেমে পড়েছে। মৈত্রেয়ীকে বললুম, “তুমি একটু শহরে গিয়ে কলকাতায় আমাদের বিশ্বভারতী আপিসে ফোন করে৷ এবং আমার স্বামীকেও খবর দিতে বলে দিয়ো যদিও তিনি এখন ' ঠিক কোথায় আছেন জানি না 'হয়তে! পতিসরের কাছে কোনো! গ্রামে রয়েছেন। আরেকটি কান্ত তুমি করবে, দাজিলিং থেকে আজ রাত্রে যদি কোনো ডাক্তার আসতে পারেন তারি ব্যবস্থাও করে এসে।1৮ মৈত্রেয়ী শহরে গিয়ে তৎপরতার সঙ্গে এই কাজগুলি সেরে এসে বললেন, “আজ রাত্রে দার্জিলিং থেকে ডাক্তার আসবার বন্দোবস্ত হয়েছে এবং কলকাতাতেও ফোন করে দিয়েছি।” এদিকে স্থনিশ্চিত হবার জন্যে আমি প্রশান্তচন্দ্রকে১ আমাদের পাশের বাড়ি থেকে ফোন করে দিলুম যাতে কালকে সকালের মধ্যে ডাক্তার নিয়ে কেউ-নাকেউ এখানে

১, অধ্যাপক শ্রীপ্রশান্তচন্ত্র মহলানবীশ

নিবাণ ২৭

উপস্থিত হন। প্রতি মুহূর্তেই দেখছি বাবামশীয় যেন কেমন হয়ে আসছেন, আমরা কেউ কিছুই করতে পারছি না, জ্বরও উঠেছে দুপুর থেকে গ্রকশ-ছুই, তাকে নিয়ে বসে আছি কখন্‌ দাজিলিঙের ডাক্তার আসবেন সেই আশায়। সন্ধ্যার দিকে আর তার কোনো জ্ঞান আছে ব'লে মনে হচ্ছিল না।

রাত্রি আটটায় দাজিলিং থেকে ডাক্তার এসে পৌছলেন, যেমন লম্বা তেমনি চওড়া একজন সাহেব। যা বলবার মৈত্রেয়ী তার সঙ্গে কথ! কইছিলেন, কথা কইবার মতো! অবস্থা তখন আমার ছিল না তিনি এলেই বললেন,“ইনিই, কি ডক্টর টেগর ।৮ তার পর ব্লাড প্রেসারের যন্ত্র হাতে বেঁধে ঘড়ি দেখতে লাগলেন, বললেন, “ক্লাড- প্রেসার খুব ভালো” হার্ট পরীক্ষ। করবার সময় পাঞ্জাবির বোতাম খুলে দিতে বাবামশায়ের লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ দেহ দেখে ডাক্তার আশ্চর্য হয়ে কলে উঠলেন, “ডাক্তার ঠাকুরের শরীরও কী হ্থন্দর। 12 2০৭ [0:. [201:6 1199 1৮ পরীক্ষা শেষ ক'রে ডাক্তার অন্য ঘরে গেলেন। আমি মেত্রেয়ীকে ওর সঙ্গে যেতে বললুম, অভিমত জানবার জন্যে। খানিকক্ষণ পরে মৈত্রেয়ী ফিরে এসে বললেন, “প্রতিমাদি, আপনি যান,

২৮ নির্বাগ

ডাক্তার কী বলছেন শুনুন গিয়ে।৮ আমি বললুম, “কী ব্যাপার ।” মৈত্রেধ়ী বললেন, “ডাক্তার আজই রাত্রে অপারেশন করতে চান, আপনার মত চাইছেন, বলছেন, “আজ রাতে অপারেশন ন। হোলে ওর জীবন-নংশয় হোতে পারে।” ডাক্তারের মতে গুর যুরিনিমিয় হয়েছে তাই ভিতরে- ভিতরে বিষক্রিয়া হওয়ার দরুন উনি অচেতন হয়ে আছেন।” ডাক্তার গোপালবাবুও ঘরের ভিতরে এসে আমাকে এই কথাই বললেন যে, ডাক্তার আমার মত পেলে আজ রাত্রেই অপারেশনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এখন কী কর! কর্তব্য, আমার মতের উপরেই সব নির্ভর করছে। ভগ্নবান আমাকে কী পরীক্ষার মুখে ফেললেন। আমি মন স্থির করে বাবামশায়ের অচৈতন্য দেহের পাশে দাড়িয়ে একবার নিজের মধ্যে চিন্তা করে দেখলুম। কিন্তু আমার বিবেকবুদ্ধি অপারেশনের পক্ষে কিছুতেই সায় দিল না) তা ছাড়া এটা আমি ভালো! করেই জানতুম, এই মুহূর্তে বাবামশায়ের যদি একটুখানিও চেতন! থাকত তাহলে তিনি কখনোই অপারেশনে মত দিতেন না এটুকু আমার খুব সত্য করেই জানা! ছিল ব'লে, সেই ধারণার উপর নির্ভর ক'রে আমি আরো মনে জোর পেলুম। ডাক্তারকে গিয়ে বললুম, “আজ রাত্রে অপারেশন হোতে পারে না।

নির্বাণ ২৯

প্রথমত, আমার স্বামী এখানে উপস্থিত নেই ; দ্বিতীয়ত, কলকাতার যে-সব ডাক্তারের কবিকে দেখে থাকেন তারা কাল সকালে এখানে পৌঁছবেন, ভীদের জন্য অপেক্ষা না করে আজ রাত্রে অপারেশনে মত দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় ।” ডাক্তার এই রকম পাল্লায় বোধ হয় কখনোই পড়েননি; ভাবলেন, বাঙালী মেয়েকে ভয় দেখালেই সব ঠিক হয়ে যাবে ; বললেন, “আপনি বারো ঘণ্টার জন্য বিপদ-সম্ভাবন! কাধে নিচ্ছেন, জানেন না, কাল কী'ঘটতে পারে 10০ ০০, 1010 1115. 122০16, ০], 21০ 0915075 01০ 11510 ০06 72 18009, 0010 1010 129 109 1)211001, €0-1001:0-৮ কথাট। অত্যন্ত ভয়াবহ, মনট! কেমন চমকে উঠল, তার পরমুহূর্তে কেমন একটা বিশ্বাস গু'ড়ি মেরে যেন মনের মধ্যে সাহস জাগিয়ে বললে, না না, ডাক্তারের কথায় বিশ্বাস করে কাজ নেই। বাবামশায়ের ভবিতব্য কখনো এইভাবে শেষ হোতে পারে না, তার মধ্যে এশ্বরিক শক্তি আছে তা এত সহজে নিঃশেষ হবার নয়। আমাকে স্থিরপ্রতিজ্ঞ দেখে বোধ হয় সাহেব একটু দমে গেলেন, বললেন, “আচ্ছা আমি নিজেই প্রফেসর প্রশান্ত মহলানবিশকে ফোন করে দেখছি, যদি তিনি আজ

৩৪ নির্বাণ

রাত্রে ডাক্তার নিয়ে যাত্রা করে থাকেন তবে মিসেস টেগরের কথ অনুসারে কাল সকাল পর্বস্ত অপেক্ষা করাই ভালো |” ডাক্তার নাছোড়বান্দা, সেইরাতেই পাশের বাড়িতে গিয়ে প্রফেসর মহলানবিশরে ফোন করলেন, উত্তরে জানতে পারলেন যে, তিনি দাঞিলিং মেলে ডাক্তার নিয়ে রওনা হয়েছেন। তখন নিরুপায় হয়ে বললেন, “যখন তার! আসছেন তখন অবশ্ঠা অপেক্ষা করাই উচিত। যদি কাল আমাকে দরকার হয় ফোন করলেই আমি আসব ।৮ “গুডনাইট” ঝলে গাড়িতে উঠে বসলেন। আমিও তাঁকে বিদায় দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম

তার পর, এখন কী করা কর্তব্য। আজ রাত্রের মতে। কোনোপ্রকারে কাটিয়ে নিয়ে যেতে পারলে হয়, কিন্ত কী অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছেন তা তো আমরা বুঝতে পারছি, কেবল মাঝেমাঝে বলছেন, “আমার কী হোলে! বলো তো।৮ আমাদের হাতে আছে: একমাত্র হোমিওপ্যাথি ওষুধ, আমরা সে-বিষয়ে আবার কেউই খুব অভিজ্ঞ নই, তবে এখানকার একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন, তাকে বললুম, “আপনি ডাক্তার মজুযদীরকে১ কলকাতায় ফোন ক'রে, অবস্থায় কী

১, ডাঃ জে. এন. মজুমদার

নির্বাণ ৩১

ওষুধ দিতে পার! যায় জেনে নিন।৮ তিনি দ্বিধা না ক'রে ফোন করতে গেলেন। তখন রাত বারোটা হোলেও ডাক্তারকে বাড়িতে পাওয়! গিয়েছিল এই আমাদের সৌভাগ্য তিনি ক্যানথিরিস ৩০ ছু-ঘণ্টা অন্তর খাওয়াতে বললেন, সেই কথামতো ওষুধ চলল সমস্ত রাত। সে যেন একটা ঝড়ের রাত। নিয়তির উপর নির্ভর করে দীড়িয়ে আছি, ঝোড়ো সমুক্রে যে-জাহাজ ডুবু- ডুবু তারি দিকে অসীম ভরসায় তাকিয়ে, মন তখন আতঙ্কে স্তরূ, কেবল ভরসা হচ্ছে বাবামশায়ের অপূর্ব জীবনীশক্তি তাকে এই ছুর্যোগের রাত পার করিয়ে দেবে। ভোরের দিকে মৈত্রেপীতে আমাতে অস্ফুট আনন্ধ্বনি করে উঠলুম, তীর চেতনা ফিরে এসেছে এবং অন্য সব লক্ষণ ভালে৷ দেখা দিয়েছে। তিনি আমাদের চিনতে পারলেন, শিশ্চয় ওষুধের গুণ। কালরাত্রি শেষ হোলো, আকাশে আলো তখন ফুটে উঠছে ধীরে-বীরে।

২৮ সেপ্টেম্বর আশ! করছি এইবার কলকাতার ডাক্তাররা এসে পড়বেন। রাত পার করে তো নিয়ে এলুম, এখন সকালের ব্যবস্থা ঠিক হওয়া চাই। হাপ্রত্যাশী হয়ে বসে আছি, প্রত্যেক ঘণ্টায় মনে হচ্ছে এইবার বুঝি সব এলেন, এই রকম ছুর্ভাবনার দিন জীবনে খুবই কম

৩২ নির্বাণ

আসে। যখন আসে তখন সময়টাও যেন দীর্ঘ হয়ে দেখা দেয়। অবশেষে হর্ন যথার্থই বাজল, দেখি তিনজন ডাক্তার নিয়ে প্রশান্তছন্দ্র ঠিক সময়েই এসে পড়েছেন ডাক্তারদের মধ্যে জ্যোতিবাবু,১ অমিয়বাবু২ সত্যসখা- বাবু এসেছেন। আর এসেছেন মীর! দেবী আমি একটা সোয়াস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলুম, ডাক্তাররা এসেই তখনি বাবামশায়ের ঘরে গেলেন। ঘরে গিয়ে তাকে পরীক্ষা ক'রে দেখলেন, গুদের মধ্যে একজন সময় নষ্ট না ক'রে তখুনি গ্লকোস ইন্জেকসন্‌ দিয়েছিলেন। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিশেষ কিছু ভরসা পেলুম না, তবে তীর! এইটুকু বললেন যে, প্গ্ুনকোস ইন্জেকসনের প্রতিক্রিয়া যদি আধ ঘণ্টার মধ্যে দেখি তাহলে আজই আমরা কবিকে নিয়ে কলকাতা যাত্রা করব 1” কাল রাত্রে যে অপারেশন হয়নি তাতে তারা খুবই সন্তষ্ট হয়েছিলেন। এদিকে ছুপুর বারোটা আন্দাজ আরে্টা,.মোটর এসে পৌঁছল তাতে হ্বরেনবাবু,* অনিলবাবু আর স্থধাকান্তবাবু এসে নামলেন, এরা এসেছিলেন একৃসপ্রেসে এ'দের সকলকে দেখে ঠিক সমুদ্দে জাহাজ-ডুবি হবার মুখে রক্ষী জাহাজ

১. ডাঃ শ্রীজ্যোতিপ্রকাশ সরকার ২. ডাঃ ভ্রীঅমিয়নাথ বনু ৩, ডা প্ীসভাসথ! মৈত্র ৪. প্রীনুরেন্রনাথ কর

নির্বাণ ৩৩ এসে পড়লে আরোহীদের মনের অবস্থা! যেরূপ হয় আমার সেই ভাব হোলে।। ডাক্তারবাবুর কিছুক্ষণ পরে আমাদের বললেন, “আপনারা প্রস্তত হোন,” আজই ওঁকে আমরা নিয়ে যেতে পারব 1৮ এম্কুলেন্স প্রশান্তবাবুদের সঙ্গেই এসেছিল, প্যাক করতে বেশি দেরি হোলে না, সবই ছিল তৈরী; এর মধ্যে আমার স্বামীর টেলিগ্রামও পেয়ে গেলুম। তিনি শিলিগুড়িতে আসছেন, পতিসরের গ্রামের মধ্যে থাকার দরুন তার খবর পেতে দেরি হয়েছে, শুনলুম আগের দিন রেডিয়ো৷ স্টেশন বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে কবির অস্থস্থতার খবর আমার স্বামীর কাছে কোনে! প্রকারে পৌঁছয় আমরাও বাবামশায়কে নিয়ে কলকাতায় রওন! হুলুম, মৈত্রেয়ীকে সঙ্গে আসতে অনুরোধ করায় তিনি আসতে রাজী হুলেন। পথে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা! আর ঘটেনি, সবই ভালোয়-ভালোয় কেটে গিয়েছিল। তার পরদিন জোড়ার্সাকোতে পৌঁছে দোতলার পাথরের ঘরে তাকে শুইয়ে দেওয়া হোলো। তখন তীর চেতনা অল্প ফিরে এসেছে, বললেন, “এ কোথায় আমাকে আনলে বৌমা ।” কাছেই দীড়িয়ে ছিলুম। “বললুম, যে আপনার পাথরের ঘর।” তিনি বলে উঠলেন, “ই্যা পাথরই বটে, কী কঠিন

৩৪ নির্বাণ

বুক, একটুও গলে না।” আমি নীরবে তাকিয়ে রইলুম।

জোড়াসাকোয় আসবার পর আর কোনো ভাবন। ছিল না, চারিদিকে অসংখ্য পরিজন, বন্ধুবান্ধব জন আফ্টেক ডাক্তারে মিলে একটি কমিটি তৈরি হোলো! ধারা পরামর্শ ক'রে তার চিকিৎসা চালাবেন এবং সেই সঙ্গে একটি সেবক-সেবিকা-সংঘও গঠিত হোলো কিন্তু এই ব্যাপারটি ছিল মুশকিলের ; যখন তিনি স্থস্থ ছিলেন মজ। করে বলতেন, “মহাত্মাজী আমার চেয়ে ভাগ্যবান, তার সেবক-সেবিকার অভাব হয় না।” আজ তিনি সজাগ থাকলে বুঝতেন তিনিও কম সৌভাগ্যবাম নন, তারও সেবার জন্যে কত লোকে আজ লালায়িত। কিন্ত সকলের সেবা তিনি গ্রহণ করতে পারতেন না, ভার মনের মতে] সেবক হোতে গেলে,কতগুলি বিশেষ গুণ থাক! দরকার হোত। সে-ব্যক্জির স্পর্শ হবে কোমল, থাকা চাই তার ঈষৎ ইঙ্গিতেই সব বুঝে-নেবার মতো প্রখর কল্পনাশক্তি, এবং সেহুবে সদাপ্রফুল্ল, হাতের কাজে নিপুণ, উপরস্ত রহস্তালাপের সমজদার। এই সব গুণ কিছু-কিছু না থাকলে তার সেবকশ্রেণীভূক্ত হওয়৷ কারুর পক্ষেই সম্ভব হোত না। তীর হুস্থ অবস্থায়,

নির্বাণ ৩৫

শান্তিনিকেতনে এবং অন্যত্র অনেকবার দেখেছি আগ্রহ করে অনেকে পদসেবা করতে আসতেন। এমন দিন গিয়েছে, চেয়ারের পিছনে বসে দেখেছি তিনি চোখ বুজে বসে আছেন। আমি ব্যাপার দেখে মনে-মনে হাসতুম, ভাব দেখে বুঝতুম বেজায় বিপদে পড়েছেন-_ইীর স্বাভাবিক সৌজন্যে তাঁদের নিরস্ত হোতে বলতে বাধছে, অথচ বুঝছি মোটেই আরাম বোধ করছেন না। খানিক পরে ব্যক্তিটি যখন নিজে থেকে উঠে যেতেন তখন আমাকে ডেকে বলতেন, «বৌমা, আমার পা একেবারে গেছে, সকলের স্পর্শ আমার গাঁয়ের চামড়া,জানি না কেন সইতে পারে না, অথচ কিছু বলতেও খারাপ লাগছিল এত আগ্রহ ক'রে উনি পা টিপে দিচ্ছিলেন ।” এই রকম ব্যাপার অনেক সময়ই হোত। হেন ইন্ড্রিয-বোধতীক্ষ- রুগীর সেবায় খুব দক্ষতার দরকার। সেবক-সেবিকার দলের যে-কমিটি তৈরি হোলে! তাতে ধারা 'রইলেন সকলেরই কিছু-না-কিছু পূর্বোক্ত গুণগুলি ছিল। ধার! তীর সেবার কাজ মাথা পেতে নিয়েছিলেন তাদেরই নাম রইল নিম্নোক্ত তালিকায় : নন্দিতা কৃপালিনী, অমিত ঠাকুর, রানী মহলানবিশ, মৈত্রেয়ী সেন, শ্রীমতী ঠাকুর, রানী চন্দ, স্থরেন্দ্রনাথ

৬৬ নির্বাণ কর, বিশ্বরূপ বস্ত্র, অনিলকুমার চন্দ, হৃধাকান্ত রায় চৌধুরী, সরোজরঞ্জন চৌধুরী, বীরেন্দ্রমোহন সেন, ইত্যার্দি। সকলেই তীর প্রিয় শিষ্য অনুরক্ত ভক্ত এ'দের হাতের সেবায় তিনি বিশেষ আনন্দলাত করতেন।

জোড়ার্সীকোয় আসবার ছুদিন পরে ওয়ার্ধ থেকে শ্রীযুক্ত মহাদেব দেশাই এলেন পুঁজনীয় মহাত্মাজীর বার্ত! নিয়ে। সেদিন বাবামশায়ের চেতনা ফিরে এসেছে কিন্তু জীবন-আশঙ্কার কারণ তখনো! দূর হয়নি মহাদেব দেশাই অনিলকুমারের সঙ্গে বাবামশায়ের ঘরে এসে, মহাত্সাজীর সহানুভূতি, আন্তরিক" প্রেম প্রীতি জানালেন অনিলকুমার জোরে-জোরে মহাদেব দেশই মহাশয়ের বার্তা গুরুদেবকে বুঝিয়ে দ্রিলেন, কেননা তখন তিনি ভালে! করে শুনতে পাচ্ছিলেন না ভার চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল, চোখের জল তার এই প্রথম দেখলুম নার্ভের উপর এত বেশি “সংযম তাঁর ছিল যে, অতি বড়ো শোকেও তাঁকে কখনো৷ বিচলিত হোতে দেখিনি, আজ যেন বাঁধ ভেঙে গেল

এই সেবার সূত্রে দূরের বন্ধুরা অনেকে এসেছিলেন তার কাছে। গুরুদেবের জীবনের শেষ বর্ষে তার ধন্য হয়েছিলেন সঙ্গ লাভ ক'রে তিনি মেয়েদের হাতের সেবাই

নির্বাণ ৩৭ পছন্দ করতেন বেশি, বলতেন, “মেয়েরা হোলো মায়ের জাত, সেবা করা ওদেরই সাজে ।” যদিও ওঁর ভক্ত সেবকর! মেয়েদের চেয়ে কিছু কম করেননি এবং হথনিপুণ ভাবেই করতে পারতেন তাঁর সেবা, কিন্তু তবু বাবা- মশায়ের পক্ষপাতিত্ব ছিল মেয়েদেরই উপর, এট! মেয়েদের কম গৌরবের নয়। সেবা গ্রহণ সম্বন্ধে তার ভারি একটি

কোচ ছিল, তার সতত মনে হোত বুঝি তিনি সকলের উপর জুলুম করছেন। শান্তিনিকেতনে ফেরবার পর নিজের মনকে সাস্তবনার ছলেই একদিন বলছিলেন, “মা-মণি আমার কাছে ধারা আসেন তাদের সময় ব্যর্থ যাবে না, আম্বার ক্ষমতা আছে প্রতিদানের। ভাদের অধ্যাত্মলোকে আমার শেষ স্পর্শ রেখে যেতে পারব “শেষ লেখা'র কবিতায় তিনি তাঁর মনের ভাব লিখে গেছেন : |

আমি চাহি বন্ধন যার!

তাহাদের হাতের পরশে

মতের অস্তিম গ্রীতিরসে

নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ

দিয়েছি উজাড় করি" যাহা কিছু আছিল দিবার

৩৮ নির্বাণ প্রতিদানে যদি কিছু পাই,

কিছু স্গেহ, কিছু ক্ষম তবে তাহা সঙ্গে নিয়ে যাই ॥-_-শেষ লেখা, ১০

জোড়ার্সাকোয় বাবামশায় ছু-মান রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন, কী কষ্ট পেয়েছেন চোখে ফাঁরা দেখেছেন তারাই জানেন। তার এই অস্ন্ছতার মধ্যে পুজোর “আনন্দবাজার” বেরল, তাতে ল্যাবরেটরি গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল, অন্থখের মধ্যে সেদিন তিনি ভালে৷ ছিলেন তাই কাগজখানি আসবামাত্র আমার স্বামী তা নিয়ে গিয়ে তাঁকে দেখিয়েছিলেন। কী'আগ্রহ তাঁর গল্পটি দেখে, ডাক্তারদের বারণ সত্বেও তিনি কাগ্রজখানি হাতে নিয়ে আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে গেলেন। সোঁহিনীকে নিয়ে যখন কেউ-কেউ আলোচনা করতেন, তাদের প্রায়ই বলতেন, “সোহিনীকে সকলে হয়তো বুঝতে পারবে না, সে একেবারে এখনকার যুগের সাদায়-কালোয় মিশনো খাঁটি রিয়ালিজ্ম, অথচ তলায়-তলায় অন্তঃসলিলার মতো আইডিয়ালিজমই হোলে সোহিনীর প্রকৃত স্বরূপ বন্ধুবান্ধব এসে গল্পটির প্রশংস! করলে অস্থখের মধ্যেও তার মুখ কত উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

অক্টোবর-নভেম্বর কলকাতায় কেটে গেল, এই

নির্বাণ ৩৯

সময় ডাক্তারদের মধ্যে আবার আলোচন। হোতে লাগল অপারেশন হোতে পারে কিনা কিন্তু সার নীলরতনের মত না হওয়াতে তখনকার মতো অপারেশন স্থগিত রইল প্রথম মাস বাবামশায়ের চেতন ঝাপসা! ছিল, মাঝে- মাঝে সচেতন হতেন আবার ঝিমিয়ে পড়তেন, দ্বিতীয় মাস থেকে তিনি সম্পূর্ণ চেতন! ফিরে পান এবং মুখে- মুখে ছড়া তৈরি করেন, কবিতা লিখতে থাকেন, সেই সময় আশেপাশে ফাঁরা থাকতেন তীরা টুকে নিতেন সেই সব রচনা। ডাক্তারদের মতে তখনকার মতো বিপদজনক সময় কেটে গেলেও তিনি পূর্বের মতো সুস্থ হোতে পারেননি তখন তিনি রুগী ডাক্তাররা নভেম্বর মাসে তাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাবার অনুমতি দিলেন। সেখানকার খোলা হাওয়া, শীতের তাজা ভাব, সমস্তই প্রথম, ধাকায় তার দেহ-মনকে সজাগ করে তুলল, মনে হোলো! হয়তো একট৷ আরোগ্য আসবে হয়তো আবার পূর্বের মতো! চলে-ফিরে বেড়ানে৷ তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে। কলকাতায় থাকার সময় শেষের দিকে যে-কবিতাগুলি লিখেছিলেন, বেশির ভাগ সেই- গুলিই “রোগশয্যায়। নাম দিয়ে ছাপা হোলো। এই বই এবং “আরোগ্যের অনেক কবিতাই

৪৪ নির্বাগ

তার নিষ্ঠাবান অনুরাগী সেবক-সেবিক্ষার উদ্দেশে লেখা

বোগের সৌভাগ্য নিয়ে তার আবির্ভাব

দেখেছিন্ত যে-ছুটি নারীর১

লিগ্ধ নিরাময় দূপে

রেখে গেছ তাদের উদ্দেশে ,

অপটু লেখনীর প্রথম শিথিল ছন্দোমালা

_রোগশয্যায়, উৎসর্গ ধাদের সেবায় দেহের অত্যন্ত ক্লিউতার দিনে তাকে

শাস্তি স্বস্তি দিত, সেই অনুরক্তদের অন্তরাত্মাকে গভীর যাতনার মধ্যেও তিনি নিবিড়ভাবে অনুভব করতেন। তাদের প্রত্যেকেরই সত্য মৃতি তার কাছে ধরা পড়ত। তারা নবজন্মলাভ করতেন তার চেতনালোকে, সেই সব মানব-মানবীর আধ্যাত্মিক, ছবি রূপায়িত হোলো “রোগশয্যায়"এর আবেগময় ছন্দে

বিশ্বের নিত্য স্থধ!

করিয়াছি পান।

প্রতি মুহূর্তের ভালোবাসা

তার মাঝে হয়েছে সঞ্চিত ।- রোগশয্যায়, ২৬

টিকা নি এতখানি নির্বলের ছিল আবশ্তক

১. ভ্রীদলিত| কৃপালিনী ভ্রীঅমিত| ঠাকুর

নির্বাণ | ৪১

অবাক হইয়া তারে দেখি, রোগীর দেহের মাঝে অনস্ত শিশুরে দেখেছে কি আরোগ্য। ১৯

“আরোগ্যের বেশির ভাগ কবিতাই শান্তিনিকেতনে লেখা হয়েছে ; কবিতাগুলির মধ্যে দেখি তিনি যেন তীর যাত্রার পাল! আবার নব অনুস্ভূতিতে পুর্ণ করে নিচ্ছেন, আশার বাণী আবার যেন তকে উদ্দীপ্ত করে ভুলছে নৃতন জীবনের প্রেরণায় :

চৈতন্যের পুণাশ্োতে

আমার হয়েছে অভিষেক

ললাটে দিয়েছে জয়লেখ,

জানায়েছে অম্বতৈর আমি অধিকারী

পরম আমির সাথে যুক্ত হোতে পারি

বিচিত্র জগতে

প্রবেশ লভিতে পারি আনন্দের পথে --আরোগ্য, ৩২

শান্তিনিকেতনে আসার পর থেকে বিশ্বভারতীর কর্মীরাই তার সেবার কাজ শেষ পর্যস্ত গ্রহণ করেছিলেন স্থরেন্দ্রবাবু সেবার সমস্ত ব্যবস্থার ভার নিয়েছিলেন নিজের উপর, তাছাড়। স্ধা কান্ত,অনিল, রানী চন্দ, বিশ্বরূপ,

রম

৪২ নির্বাণ

ভদ্র! দেবী, সরোজ্, তেজেশবাবু১ সকলেই তাঁদের পিতৃতুল্য গুরুদেবকে প্রাণ ভরে সেবা করেছিলেন। আমাদের পরমকল্যাণীয়া নন্দিতা ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান সেবিক1। দেহ্‌সংক্রান্ত সকল বিষয়েই তাঁকে একটি ছোটো শিশুর মতো! করে রাত্রিদিন লালন করতে হোত। তিনি অনেক সময় হেসে বলতেন, “আমি ছ-মাসের গ্ল্যাকৃসো- বেবি হয়ে গেছি ।৮ ভাক্তার দীননাথ চট্টোপাধ্যায় ভার কাছে সব সময় থাকতেন। প্রথম-প্রথম নূতন (লোক ব'লে বাবামশায় তাঁর সেবা গ্রহণ করতে সংকোচ বোধ করলেও শেষের দিকে তাঁর সঙ্গে সন্বন্ধটি সহজ হয়ে উঠেছিল।

পৌষ উৎসবের কয়েকদিন আগে ১০ ডিসেম্বর চীন থেকে এলেন মহামান্য অতিথি রাষ্ট্র-মন্ত্রী তাই-চী- তাও। রাষ্ট্রসংক্রাস্ত লোকের সঙ্গে গুরুদেবের এই শেষ আলাপ-আলোচনা অন্ুস্থ *হওয়া সত্বেও অতিথির অভ্যর্থনার অভিনন্দনপত্র তিনি নিজেই লিখে দিয়েছিলেন

এদিকে ৭ই পৌষ এল, তার মন