প্রবন্ধ সংগ্রহ

আদান-প্রদান

হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর বন্ধ সধ্গ্রহ

নামবর সিং

সুব্রত লাহিড়ি

প্রচ্ছদ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা তৈলচিত্র (মর্ডান আর্ট গালারি, নয়াদিল্লি)

[৩১9৭ 81-237-2447-60

1998 (শক 1920) মূল মুকুন্দ দ্িবেদী, 1990 ংলা অনুবাদ ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইণ্ডিয়া 07181741 17701 17116 :10182811018580 191০4) : ১৪101111110] 1907:010 172/15191101 : 1142110147580 1)৬/150011 1941041701)0 ১০) 114 মূল্য : 55.90 টাকা নির্দেশক, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইপ্ডিয়া, এ-০ শ্রীন পার্ক নয়াদিল্লী-110016 কর্তৃক প্রকাশিত

[১ নি

১৫ নু নুরুহু ইহ নর

অশোক ফুল শিরীষ ফুল

আবার আমের বোল এসেছে বসম্ত এসে গেছে

নখ কেন বাড়ে

যখন বুদ্ধশূনয

শব সাধনা

ঠাকুরের জন্য বৈঠক

নিরাশ হব কেন? ভীম্মকে ক্ষমা করা হয়নি

একটি কুকুর একটি ময়না

ব্যোমকেশ শাস্ত্রী ওরফে হজারী প্রসাদ দ্বিবেদী আমার জন্মভূমি

ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক সমস্যা

মানুষই সাহিত্যের লক্ষ্য

কবীর : এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব

মেঘদূত : একটি পুরোনো গল্প

অনেক নেচেছি হে গোপাল!

1)

107

ভূমিকা

হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী কাশীর পণ্ডিতদের সেই এঁতিহ্যের অন্যতম প্রতিনিধি, যে এতিহ্য রামাবতার শর্মা, চন্দ্রধর শর্মা গুলেরি, রাহুল সংকৃত্যায়নের মত তেজস্বী পণ্ডিতরা বিংশ শতাব্দী পর্যস্ত বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এবং যার ফলে হিন্দি ভাবনা-সৃষ্টি “পুনর্নবতা” পেয়েছে। আজ আমরা যাকে 'আধুনিকতা" বলি তা পুনর্নবতার অন্য নাম। যদি কেউ কেউ এতে উত্তর-আধুনিকতার' পূর্বাভাষ পেয়ে যান, তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

“পুনর্নবা' হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর একটি উপন্যাসের নামই নয়, তার সমস্ত রচনাকর্মের বীজশব্দ। আসলে কালিদাসের “ক্রেশঃ ফলেন হি পুনর্নবতাং বিদ্যতে'কে একটি নতুন অর্থে দ্বিবেদী পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তার লেখায় প্রায়ই কালিদাসের ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়, কিন্ত পুনর্নবা-য় তো নিজের সৃজনমূলক বেদনা ব্যক্ত করতে চন্দ্রমৌলি রূপে কবি কৃলগুরুকে উপস্থিত করেছেন আর নিজের কল্প-সৃষ্টির মুখ দিয়ে ঝরে পড়েছেন :

'আমার নিজের মনের বিক্ষোভ শুধু আমার মনেই আঁটে। পৃথিবীর সর্বত্র তার কোনও না কোনও অংশের সাম্য পাওয়া যায়। প্রতিটি গাছপালা! তার কিছু না কিছু আভাস দেয়, কিন্তু একত্রে যদি সেই সাম্য ঠিক ঠিক কোথাও বিদ্যমান থাকে, তাহলে তা শুধু 'আমার মনেই আছে। বাইরের রূপসামগ্রীর মাধ্যমে তাকে কোনওভাবে পূর্ণরূপে অভিব্যক্ত করা যেতে পারে না; শব্দ তাকে কি প্রকট করবে!

তবে তো একরকম “হনৈকত্র কচিদপি তে চগ্ড সাদৃশ্যমস্তি'রই ব্যাখ্যা, কিন্তু ব্যাধ্যাও কি অপূর্ব! স্বয়ং ছিবেদীকে দেখেও এই বলতে ইচ্ছা করে : এক জায়গায় কোথাও তোমার সাদৃশ্য নেই। নেই কোথাও তোমার সমতা!

মূল কারণ হলো মনের সেই বিক্ষুব্ধতা__অপূর্ব সৃজনেচ্ছা, যার ঠিক ঠিক সাম্য যদি কোথাও থাকে তবে তা সৃষ্টিকর্তার মনে আছে। তবে অভিব্যঞ্জনার জন্য অনেক রকমের রূপ সুলভ, কবিতা ছাড়া গদ্যে, গল্প-উপন্যাস প্রবন্ধে আছে। কিন্তু দ্বিবেদী, এর মধ্যে তৈরি কোনও রূপে সৃষ্টি-ইচ্ছা এঁটে যেতে পারে, বলে মনে করেন না। লেখার জন্য তিনি চার চারটি লম্বা গল্প বা উপন্যাস আর “অশোক ফুলের” মতো কয়েক ডজন ছোট গদ্যকৃতিও লিখেছেন “যা ললিত প্রবন্ধ" নামে ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেগুলি কি ঠিক ঠিক উপন্যাস বা প্রবন্ধ? এমন কত প্রবন্ধ আছে যাতে কোনও না কোনও গল্প গাথা আছে আর এমন উপন্যাসও আছে যার মধ্যে পরিপূর্ণ প্রবন্ধ আছে। অর্থাৎ চিরপরিচিত ধারায় এমন তালগোল কেন? উপন্যাস ঠিক উপন্যাস নয়, আর প্রবন্ধও ঠিক প্রবন্ধ নয়? এও কি কোনও পুনর্নবতা, পুনর্নবা বিধার একটি প্রচেষ্টা?

ছ্বিবেদী নিজে এমন কোনও দাবি করেননি। নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে এগুলোকে উনি গপ্পো" বলেন। ভার অভিন্ন ব্যোমকেশ শান্ত্রীর কথা ভুল নয় যে, কেউ গপ্পো করা তার কাছে শিখুক। ব্যোমকেশ শান্ত্রী এও বলেন যে, যখন উনি নীরস কাজে ক্রাস্ত হয়ে পড়েন তখন গপ্পো রচনায় বিশ্রাম পান। “নীরস কাজ" অর্থাৎ প্রাচীন ভারতের কলা বিনোদ" বা নাথ সম্প্রদায়'- এর মতো গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, তার তুলনায় “অশোক ফুল” “বাণভট্রের আত্মকথা অবশ্যই গঞ্পো। বিড়ম্বনা হলো, আচার্য দ্বিবেদী যে লেখাগুলোকে “গপ্পো বলেন,

৬11 হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

সেইগুলিই সবচেয়ে হদ্য এবং মূল্যবানও। কোনও কোনও প্রবন্ধে গপ্পো বলা অংশই সারবান মনে হয়, বাকিগুলো গুরুগন্ভীর ছাড়াও ঘসামাজা বলে মনে হয়, যেমন . “অধধার্ষবাক' প্রবন্ধটি আসলে একটি বক্তৃতা। আটাশ পৃষ্ঠার এই লম্বা ভাষণের প্রারভ্িক ভূমিকার দুপাতা ছাড়া বাকি ছাব্বিশ পাতার অনেকটা বেকার কথায় ভরা। যাতে দ্বিবেদী কোথাও উপস্থিত নেই। দ্বিবেদীকে সেখানেই দেখা যায়, যেখানে তিনি নিজের নিরদ্ধিতার কথা বলার জন্য ভুসুকুর আড়ে একটি গপ্পো ফেঁদে বসেন। বিচিত্র কথা হলো যে এই মজার গঞ্পেই তিনি 'আর্ধবাক” থেকে ভিন্ন 'অর্থার্ষবাক'-এর মত গভীর তত্ব সংকেতও দিয়ে ফেলেন, যা শুনে বৌদ্ধদর্শনের পণ্ডিতরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে এমন শব্দ এর আগে তারা কখনও শোনেননি।

অর্থাৎ এই গপ্পোই দ্বিবেদীর নিজের বিধা; “গপ্পো” নয়, “কোরা গঞ্পো'। তৎসম নয়, তত্তব। কিছু ভিন্ন অর্থব্যঞ্জক। কিছুটা কল্পের” কাছাকাছি হয়তো। দ্বিবেদী নিজে কোথাও এটি খোলসা করেননি। কোথাও কোথাও অবশ্য ঝলক আছে। যেমন “দেবদার' প্রবন্ধে দেবদারু কাঠ দিয়ে ভূত তাড়নো পণ্ডিতের কথা বলে, হঠাৎ গম্ভীর হয়ে দ্বিবেদী গঞ্পের মহিমা বলতে লাগলেন। এইভাবে-_ আদিকাল থেকেই মানুষ গপ্পো তৈরি করছে, এখনও তৈরি করে যাচ্ছে। আজকাল আমরা এঁতিহাসিক যুগে বাস করি। প্রাটীন মানুষ কিংবদত্তি যুগে বাস করত, যেখানে ভাষা-মাধ্যমকে তারা অপূর্ণ মনে করত, সেখানে কিংবদত্তি গপ্পো- ভাষার অপূর্ণতা ভরার চেষ্টা। আজও কী আমরা কিংবদস্তি তত্ব প্রভাবিত নই? ভাষা ভীষণভাবে অর্থে বাধা। তাতে স্বচ্ছন্দে সঞ্চারশক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে। কিংবদত্তি স্বচ্ছন্দ বিচরণ করে। ভাষার অভিব্যক্ত ভাষাতীতকে আশ্রয় করে, কিংবদস্তির আবরণ সরিয়ে তথ্যানুসারে যিনি অর্থপ্রদান করেন, তাকে মনোবিজ্ঞানী বলা হয়, আবরণের সার্বভৌম রচনাশীলতা চিনতে পারা ব্যক্তিকে শিল্পসমীক্ষক বলা হয়। দুজনকেই ভাষার সাহায্য নিতে হয়, দুজনেই ধোকা খায়। ভূত তো সর্ষেতে। যা সত্য, তা সৃজনশক্তির স্বর্ণপাত্রে মুখ বন্ধ হয়ে ঢাকা থেকেই যায়। একের পর এক গঞ্লের স্তর জমে যাচ্ছে। সমস্ত চকচকে ঝিনুক কে রূপো ভাবা মানুষের অভ্যাসমাত্র। গপ্পো কোথায় নেই, কি নেই?"

যাকগে ছাড়ুন তো” বলে দ্বিবেদী এই গল্ভীর তত্ব বিবেচনার উপসংহার করে ফেললেন। কিন্তু দ্বিবেদী রচনা-সংসারের ওপর এই বক্তব্য লাগালে তো এই নিক্ষর্ষ বেরোবে যে, তার লেখায় কোথাও গপ্পো নেই। এইট্ুকুই নেই, বরঞ্চ যা কিছু আছে সবটাই গপ্লো। তাহলে “গঞ্পো কি নয়” কথার মানে কি দাঁড়ায়? এই দৃষ্টিতে “অশোক ফুল" শিরীব ফুল" তো গঞ্পোই, আম, দেবদার আর কুটজও গপ্পোই। এই অর্থেই গপ্পো, এর মধ্যে প্রত্যেকটি নিয়ে কিংবদস্তি গড়া হয়েছে। কোথাও পুরোনো কিংবদস্তির অর্থানুসন্ধান করে একটি নতুন কিংবদস্তির সৃষ্টি আর কোথাও পুরোনো কিংবদত্তির সাহায্যে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে।

এই কথা নিয়ে আমার মনে বরাবর কৌতুহল হয় যে 'কল্পলতা'র ওপর কোনও প্রবন্ধ না লিখেও নিজের একটি প্রবন্ধ সংগ্রহের নাম দ্বিবেদী 'কল্পলতা” কেন রাখলেন? তিনি কি প্রবন্ধমাত্রকেই কল্পলতা মনে করতেন? কল্পবৃক্ষ নয়, কল্পলতা। লতায় খুলে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ার যে স্বচ্ছন্দ বৃত্তি আছে, তা বৃক্ষে কোথায়£ কল্পের সঙ্গে কল্পনার কোনও

ভূমিকা

সম্পর্ক থাকলে তো কল্পনার লতাই হতে পারে, গাছ নয় যে এক জায়গায় দাড়িয়ে থাকার জন্য অভিশপ্ত, আর দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে মত্তদশায় দোল খাওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারে না।

যাইহোক, এইটুকু স্পষ্ট যে 'কল্পলতা' দ্বিবেদীর খুব প্রিয় ছিল। ছ্বিবেদীর প্রিয় কবি কালিদাসেরও “কল্পলতা" খুব পছন্দ ছিল। “অভিজ্ঞান-শকুত্তলে'র এই ছন্দে যে সাজ-সজ্জায় কল্পলতা বর্ণিত হয়েছে, তা পড়ে তার উপযোগের লোভ সম্বরণ করতে কে পারে__

বিচ্ছিত্তিশেষৈঃ সুরসুন্দরীণাম্‌ বর্ণেরমীকল্পলতাংশুকেনু। বিচিস্ত্য গীতক্ষমমর্থজাতং দিবৌকসত্তচ্চরিতং লিখস্তি।।

দ্বিবেদীও একাধিকবার এই ছন্দের ব্যবহার করেছেন। সবচেয়ে হাদ্য প্রসঙ্গ হলো 'পুনর্নবা'র, যখন দেবদত্ত মঞ্জুলার চিঠি পেল-_'পুরো চিঠি কাজলকে কালি তৈরি করে লেখা হয়েছিল। দেবদত্তের হৃদয় ভীষণভাবে আলোড়িত হতে লাগল। তার মুখ দিয়ে অনায়াস বেরিয়ে এলো “বিচ্ছিত্তডিশেষৈঃ সুরসুন্দরীনাম্” _সুরসুন্দরীদের প্রসাধনের পর পড়ে থাকা শৃঙ্গারদানের রঙ থেকে! তাহলে মঞ্্রলা নিজের শৃঙ্গারদানির সবচেয়ে মহার্ঘ এবং সুন্দর প্রসাধন সামগ্রী দিয়ে এই চিঠি লিখেছে।'

'অশোক ফুল" প্রবন্ধ পড়ার সময় কি আমাদেরও এই রকম মনে হয় না! প্রবন্ধের লালিত্য অনেকটা এমন যাদু করে যেন দেবাঙ্গনার প্রসাধনে পড়ে থাকা বিভিন্ন রঙ দিয়ে দেবতারা কল্পলতার অংশুকের ওপর কোনও যশগান লিখেছেন।

এই প্রসঙ্গে দ্বিবেদী 'কল্পবল্লী'রও যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা মনে হয় প্রাসঙ্গিক। লিখছেন : 'কল্পবল্লী যার অর্থ হয় না, ভাব হয় না, হয় কেবল ছন্দ, কেবল লয়, কেবল গতি-বিশুদ্ধ ইচ্ছা তপঃপৃত মহাত্মার আশীর্বাদের সমান কেবল মঙ্গলেচ্ছা। অর্থ তার পেছনে দৌড়োয়। যা নৃত্যে তাণ্ডব, তাই চিত্রে কল্পবন্লী আচারে মাঙ্গল্য-আশীর্বাদ।

এই চিত্রের কল্পবল্লীর সঙ্গে সাহিত্যের কল্পবল্লীর কোনও সম্পর্ক তৈরি হয় কী? দ্বিবেদী যখন নিজের প্রবন্ধ সংগ্রহের নাম “কল্পলতা” রেখেছিলেন তখন 'কল্পবল্লীর' এই অর্থ কী তাঁর মনে উপস্থিত ছিল? তাঁর সব লেখার না হলেও কিছু ছন্দ সই. খালি প্রবন্ধই আছে, লয়ই আছে গতিই :আছে, ভাব বা অর্থ নেই?£ অথবা ভাব অর্থ গৌণ; সুন্দর হলে তা নিজের ছন্দ লয়ের জন্যই।

অনেক্ষটা সেইরকম কথা যা জর্জ লুকাচ “রূপ' সম্পর্কে কখনও বলেছিলেন__ যখন কোনও বস্ত্র নিজের সমস্ত অস্তর্বস্তকে রূপে মিশিয়ে দেয়, আর সেই প্রক্রিয়ায় শুদ্ধ শিল্প হয়ে গেলে তা ফালতু হয় না।

ছন্দ" দ্বিবেদীর প্রিয় শব্দ যার কথা প্রায়ই তার মনে পড়ে এবং বিশিষ্ট অর্থে তিনি যার প্রয়োগ করেন। দেবদারু তাঁর কাছে মূর্তিমান ছন্দ মনে হয়। তার ঝাকড়া ডাল কাটাভরা পাতার এমন তরঙ্গায়িত ছন্দবিতান টাঙায় যে ছায়া চেরির মতো অনুগমন করে।” আবার, “গাছ কি, সিদ্ধ কোন কবির হৃদয়ের মুর্তিমান ছন্দ__ প্রথিবীর আকর্ষণকে অভিভূত করে তরঙ্গায়িত বিতান শৃঙ্খলাকে সাবধানে সামলিয়ে, বিপুল আকাশের দিকে

& হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

একাগ্রীভূত মনোহর ছন্দ।' দ্বিবেদীর দৃষ্টিতে তা “অর্থাতীত ছন্দ, আর এইজন্য “অর্থাতীত আনন্দ'-ও। মহাদেবের তাগুবতুল্য। দুটির মধ্যে তিনি মিল দেখেন। একদিকে দেবদারুর গগনচুস্বী শিখা আর অন্যদিকে সমাধিস্থ মহাদেবের নির্বাত নিষ্কম্প প্রদীপের উধ্বগামী জ্যোতি! আসলে, এই প্রসঙ্গে একাগ্রভাবই ছন্দের আত্মা। অন্যত্র তিনি সমষ্টিব্যাপী জীবনগতির সমান্তরালে চলা ব্যষ্টিগত প্রাণবেগকে ছন্দ নাম দেন। তাৎপর্য হলো, ছন্দ দ্বিবেদীর নিজস্ব প্রাণবেগ। এইজন্য তার গদ্যেও ছন্দ আছে। তা পদ্যের ছন্দ নয়, গদ্যের নিজস্ব ছন্দ।

“দেবদারু' থেকেই প্রাণবেগী গদ্যের উদাহরণ নেওয়া যাক :

কিন্তু এমন কিছু লোক হয়, যারা মুড়ি মুড়কি এক দেখেন। তারা সবাইকে একই রকম দেখেন। তাদের কাছে সেই হৃতস্বাস্থ্য সেই কত্তা, সেই কিপ্টে, সেই খ্যাপাটে, সেই ঝঞ্জাটে, সেই লোমশ সেই বাচাল, সেই ভীতু, সেই খিটধিটে, সেই রগচটা, সেই মাথা দোলানো, সেই হাট্টাকাট্রা, সেই দুষ্টু, সেই চনমনে, সেই বাঁকা, সেই চতুরঙ্গী সব সমান।'

দেশি তত্তুব বিশেষণের এই লম্বা তালিকা একসঙ্গে দেখে খুব মজা পাওয়া যায়। নিজের কবিতায় কোনও কবি এমন পংক্তি কি জুড়বেন? কিন্তু না, প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে যায়, অন্দ্রেয়ও কখনও কখনও এমন কৌশল দেবিয়েছেন। যেমন “অসাধ্য বীণা”তেই রয়েছে।

কিন্তু এমন দমভাঙা ছন্দ সব জায়গায় নেই। ভাবদশার সঙ্গে সঙ্গে ছন্দেরও ফের বদল হতে থাকে-_-গতি যতির নতুন নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উদাহরণ স্বরূপ কবীরের ব্যক্তিত্বের ছন্দ এই রকম : “এমন ছিলেন কবীর। আপাদমস্তক আপনভোলা, স্বভাবে বুদ্ধিদীপ্ত শক্তিশালী, ভেতরে নরম, বাইরে কঠোর, জন্ম থেকে অস্পৃশ্য, কর্মে বন্দনীয়।”

আর অন্যদিকে কুটজ। “ছোট-_খুবই বেঁটে গাছ। চওড়া পাতাও আছে, বড়ও আছে। ফুলে এমন ভরে আছে যে কি বলব। আজব ব্যাপার যেন হাসছে। মনে হচ্ছে যেন প্রশ্ন করছে, কি আমাকে চেন না? উজাড়ের বন্ধু তোমায় চিনি তো, তোমাকে ভালভাবে চিনি। নাম ভূলে যাচ্ছি। প্রায়ই ভুলে যাই। রূপ দেখে প্রায়ই চিনে ফেলি, নাম মনে পড়ে না। আর পরে যখন এই কুটজকেই উৎসাহিত করেন তো ছন্দ চলে যায় : “বাচতে চাও? কঠোর পাথর ভেদ করে, পাতালের বুক চিরে নিজের ভোগ্য সংগ্রহ কর, বায়ুমণ্ডল চুষে, ঝড়-বাপ্টা অগ্রাহ্য করে, নিজের প্রাপ্য উশুল কর, আকাশকে চুম্বন করে তরঙ্গে দুলে উল্লাস শুষে নাও।

ছন্দ দ্বিবেদীর মজ্জায় আছে। তার ভাষায় বললে, তার সমস্ত ব্যক্তিত্বই ছন্দে রচিত। কবিতা লিখুন বা না লিখুন, তার গদ্যই ছন্দে রচিত। কিন্তু তা পদ্যগন্ধী ছন্দ নয়। এই গদ্যের নিজস্ব ছন্দ আর তার নিজস্ব লয় আছে।

তার প্রতোক প্রবন্ধের সম্পূর্ণ গঠনে এই লয় আছে। প্রত্যেক প্রবন্ধের আরম্ভ এক বিশেষ ভাবে হয় আবার তার শেষ হওয়ারও নিজস্ব ভঙ্গি আছে। মাঝে কখনও এগিয়ে যায়, পিছিয়ে আসে, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, চক্কর মারে, যেন কোনও বিস্মৃত কথা মনে করেন, চুপিসাড়ে কোথাও সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ বা হিন্দির কোনও কবিতার

ভূমিকা না

সঠিক পংক্তি বুনতে বুনতে শেষে যেন সম অবস্থায় পৌঁছে যান। প্রবন্ধ যেন কোনও রাগবন্ধন। সংগীতের ঠাট “অশোক ফুলে" এই বন্ধ-নির্মাণ সহজেই দেখা যেতে পারে। অবশ্য অন্য প্রবন্ধেও গদ্যবিধানের এই রঙ পাওয়া যায়।

এই ছন্দোবদ্ধতার জন্যই দ্বিবেদীর প্রায় সমস্ত ভাল প্রবন্ধ থেকে গুর্জন-অগুঞ্জন হয় যা প্রবন্ধ শেষ হওয়ার পরেও মনের মধ্যে অনেকক্ষণ পর্যস্ত ঝংকার তোলে। বোঝাই যায় না যে, তা চিস্তাতরঙ্গ না প্রকাশতরঙ্গ। তরঙ্গায়িত হওয়া কত মনোহর

'গল্পো” “ছন্দ এই বীজশব্দ দুটি দিয়ে দ্বিবেদীর প্রবন্ধের গঠন বুনুনির কিছু আভাস পাওয়া যায়। গপ্পো করার এমন অবস্থা যে, কোথায় আম আর কোথায় বিছে__ তবুও দুটির মধ্যে দ্বিবেদী সম্পর্ক-সূত্র খুঁজেই ফেলেন। এইভাবেই কন্দর্প গন্ধর্বকেও ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়মে একটু নাড়িয়ে নিয়ে এক করে ফেলার চমৎকার চেষ্টা করেন।

কবি প্রসাদের শ্রদ্ধা তো নিজের স্মিতিরেখায় জ্ঞান ইচ্ছা ক্রিয়ার ত্রিপুরকেই আকাশে একজোট করেছিল। দ্বিবেদীর সৃজনমূলক কল্পনা তো না জানি কত অসম্বদ্ধ বস্তকে একসূত্রে গাথতে থাকে। বলা নিষ্প্রয়োজন, গাঁটছড়া বাঁধা গপ্পো শিল্পে হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর কোনও জুড়ি নেই। যদিও সবই “ন্যারেটিভ" গপ্পো, তবুও গণ্পোকে বিশ্বাসযোগ্য করার শিল্প দ্বিবেদীই জানতেন।

এই শিল্প কি উনি রবীন্দ্রনাথের কাছে শিখেছিলেন £ বুদ্ধদেব বসুর মতে রবীন্দ্রনাথেরও এমনি “বিদ্যুত্ধর্মিতা” ছিল। তিনিও বিদ্যুৎ চমকানোর মতো এক নিমেষেই নিজর মূল চিন্তা আমাদের সামনে উপস্থিত করে ফেলেন।' যাইহোক, তথ্য হলো যে “অশোকফুল' -এর মাধ্যমে দ্বিবেদি ভারতীয় সংস্কৃতির যে উদাহরণ প্রস্তুত করেছেন তা অবশ্যই বিদ্যুত্ধমী" এবং মৌলিকও।

এই প্রক্রিয়ায় দ্বিবেদী শব্দের সঙ্গে যেভাবে খেলেন এবং প্রতিটি শব্দের অর্থত্রীড়ায় যত রস পান তা আরও মনোগ্রাহী। আম কুটজের ব্যুৎপত্তির সঙ্গে ইতিহাসের ভাজ খুলতে যেমন রস পান তা দর্শনীয়। তার কৌতুকবৃত্তি থেকে দেবদারও রেহাই পায়নি। মজার কথা হলো নিজের উপন্যাসেও তিনি এরকম অর্থক্রীডার অবকাশ বার করে নেন আর মাত্র একটি শব্দের সাহায্যে সম্পূর্ণ কিংবদস্তি তৈরি করে ফেলেন, চারুচন্দ্রলেখে গধৈয়াতাল নিয়ে যেমন করেছেন।

উল্লেখ্য হলো যে সব জায়গায় এই অর্থক্রীড়া কেবল 'চমৎকারই' হয় না অর্থাৎ এতে রস থাকে। যেমন “মেঘদূত : একটি পুরোনো গল্পে অন্য ছন্দে আসা 'সানু শব্দের ব্যাধ্যা। পাহাড় যেখানে সামান্য সমান হয়ে নিচের দিকে ঢালু হয়, সেই ঢলকে সংস্কৃতে “সানু' বা পর্বত-নিতম্ব বলে। বিরহী যক্ষ পর্বতের সানুদেশে গায়ে লাগা কালো মেঘ দেখে। কেমন দেখে? যেন কোনও কালো মত্ত হাতি পর্বতের সানুদেশে টুসো মারার খেলা খেলছে। কোনও দিন ইন্দ্রের মত্ত হাতি এইভাবেই টুসো মেরে কুবেরের বাগান নষ্ট করেছিল। যক্ষের সোনার সংসার ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। তাকে পৃথিবীর এক কোনায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল, প্রিয়া থেকে দূর-_অনেক দূরে আজ এই মেঘও যন্ত হাতির মতো পর্বতের সানুদেশে টুসো মারছে। যক্ষ হৃদয় চঞ্চল হয়ে উঠল। তার প্রিয়তমাকে মনে ডেল.

হজারীপ্রসাদ ছ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

কিন্তু তার সাহায্যে দ্বিবেদি যে গপ্পো ফেঁদেছেন তাতে বিশেষ রস আছে। কামভাবনার এমন শিষ্ট সংকেত দ্বিবেদীর প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। নিছক চমৎকার নয় বরং রসও আছে।

যদিও দ্বিবেদি প্রত্যেক প্রবন্ধে কোথাও না কোথাও নিজের চিত্তা বা পীড়ার ছবি না দিয়ে পারেন না, তবুও সত্যি কথা হলো যে কোথাও কোথাও উনি নিজের সম্পর্কে খোলাখুলি আর কোথাও কোথাও বিষয়াস্তর করে কিছু বিস্তারিত ভাবে বলেছেন। বলতে কোনও সংকোচ নেই, তার প্রবন্ধে এই আত্মপ্রসঙ্গ সর্বোস্তম হয়ে উঠেছে বিশেষত উনি যেখানে নিজের হাসেন বা নির্মম আত্মস্বীকৃতি দেন। এই প্রসঙ্গে তার শেষ উপন্যাস 'অনামদাসের পুখ-তে “এখন অনেক নেচেছি, হে গোপাল" শীর্ষক ভূমিকা সবচেয়ে মার্মিক। তার মৃত্যুর চার বছর আগে লেখা। দ্বিবেদী বলছেন :

'মহাত্মাদের কথা স্বতন্ত্র। হয়তো তারা নিজের বাহানায় সাধারণ মানুষের মনকে কিছু ভাল কথা শেখাতে চান। কিন্তু আমি সাধারণ মানুষের মতোই ভাবতে পারি। কাউকে শেখানো উদ্দেশ্য নয়। পেছনের দিকে দেখি বিরাট রিক্ততা! যা কিছু করছিলাম তা কী সত্যিই কোনও কাজের ছিল? নিজের সীমা ক্রুটি ক্ষুদ্রতা লুকিয়ে নিজেকে এমনভাবে দেখানো যে সত্যিই আমি কিছু, এই তো করেছি। ছোট ছোট কথার জন্যে ঝগড়া করাই বাহাদুরি ভেবেছি, পেট ভরার জন্য কাড়াকাড়িকেই “কম” মেনেছি, কোনও বড় উদ্দেশ্যে সমর্পিত হতে পারিনি, কারও দুঃখ দূর করার জন্যে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারিনি। সারা জীবন কেবল লোক দেখানো, ভাড়ামি, হায় হায় করেই কেটে গেল। আমারই মতো কাউকে দেখে হয়ত তুলসীদাস বলেছিলেন__“কেউ বলুক ভাল, কিছু দাও আশা বাসনা না মন হতে যায় ।”

প্রবন্ধে মানুষ প্রায়ই ব্যক্তিব্যঞ্জকতা চায়, এমনকী ব্যক্তিব্যঞ্জক প্রবন্ধকেই প্রবন্ধ বলা হয়। এই প্রসঙ্গে প্রবন্ধ-পারদর্শী চতুর সুজান” প্রায়ই প্রবন্ধের আদি প্রবর্তক মিশেল মান্ত্যেনের কথা বলেন আর প্রবন্ধের লক্ষণরাপে মাত্ত্যেনের এই উক্তি উদ্ধাতও করেন__ “কোনও অন্য বিষয় অপেক্ষা আমি স্বয়ং অত্যত্ত একাগ্রতার সঙ্গে নিজের অধ্যয়ন করি। এই আমার তত্বজ্ঞান, এই আমার ভৌতিক শান্ত্ব। হাজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী মাত্ত্যেন পড়েছিলেন, এমন কোনও প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। পড়ে থাকলে কোথাও না কোথাও উল্লেখ করতেন কিন্তু উক্ত অবতার থেকে জানা যায় যে তিনি তুলসীদাস অবশ্যই পড়েছিলেন, বিশেষভাবে তার “বিনয় পত্রিকা”। কিন্তু মাস্ত্যেন বা তুলসীদাস পড়লেই ব্যক্তিব্যঞ্জকতা আসে না। যদি এইভাবেই ব্যক্তিব্যঞ্কতা আসে আর তা অমর কৃতিত্ব হয়ে যায়, তাহলে প্রবন্ধজগতে মাস্ত্যেনের হুড়োহুড়ি ভিড় হয়ে যেত। ব্যক্তিব্যপ্রকতা কি বস্ত, তা কোথা থেকে আসে, কীভাবে আসে তা স্বয়ং প্রবন্ধই বলে।

এইরকম আত্মব্যঞ্নকতায় অনুভবের স্ফুলিঙ্গ অনায়াসেই ছড়িয়ে পড়ে যা বাণীর মতো মনে গেঁথে বায়। দ্বিবেদি স্বীকার করেছেন, তিনি মহাত্মাদের মতো সাধারণ মানুষকে কিছু (শখাবার জন্য লিখছেন না। অর্থাৎ তিনি “কোনও তৈরি সত্য তুলে নিয়ে আমাদের হাতে রাথছেন লা? থা কিছু আছে তা নিজের অনুভূত সত্য। গভীর পীড়ার ভেতর থেকে

ভূমিকা রা বেরিয়ে আসা কিছু অনুভব-কণা। আর এইরকম এই জুলজুলে কণা দ্বিবেদীর প্রবন্ধে, যেখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে__কোথাও ফুলের গাদায়__-আর কোথাও ধূলো বা ছাইয়ের গাদায়। উদাহরণ :

__পাণ্ডত্যও একটি বোঝা যতই ভারি হয়, ততই তাড়াতাড়ি ভোবায়। যখন তা জীবনের অঙ্গ হয়ে যায়, তখন সহজ হয়ে যায়। তখন আর বোঝা মনে হয় না।' (অশোক ফুল)

_-'অবধূতের মুখ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সরস রচনা হয়েছে।' (শিরীষ ফুল)

__-“বেঁচে থাকাও একটি শিল্প। শুধু শিল্পই নয়. তপস্যাও।' (কুটজ)

_-যা সবার ভাল লাগে তাই অর্থ, একজনের লাগল, বাকিদের লাগল না, তাহলে অনর্থ।'

__ শীন্ত্রার্থে কেউ হারে না, হারানো হয়।'

_-“সমস্ত লাগালাগি ভ্রম। চোখেরও।' (দেবদারু)

__পণগ্ডিতদের কথার সঙ্গতি লোক পরম্পরা থেকেই হয়।' (আমে আবার বোল এসেছে)

_দুর্বলদের মধ্যে ভাবুকতা বেশি হয়।' (বসস্ত এসে গেছে)

_-বিসম্ত আসে না, নিয়ে আসা হয়।'

-_-সাফল্য এবং চরিতার্থতায় পার্থক্য আছে।' নেখ কেন বাড়ে)

-__এ বোঝা বড় কঠিন যে কখন পণ্ডিতের শাস্ত্র তার বুদ্ধি ঢেকে ফেলে আর কখন তার বুদ্ধি শান্ত্রকে।' (ঠাকুরের জন্য বৈঠক)

__“একবার ভুলভাল যা বলে দিলাম, তার সঙ্গে চিপটে থাকা ভীষণ হতে পারে, হিতকর নয়।'

_-কিরিয়েরা ইতিহাস-নির্মাতা হয়, খালি ভাবিয়েরা ইতিহাসের ভয়ংকর রথচক্রের নিচে পিশে যায়। ইতিহাসের রথ তারাই চালায় যারা ভাবে ভাবনাকে রূপ দেয়।” (ভীম্মুকে ক্ষমা করা হয়নি)

__“দেবতাই দেবতাকে মারতে জানে। লোহাই লোহা কাটতে পারে।' (মেঘদূত : এক পুরোনো গল্প)

_ “কারও ভাল না হলে তার কল্পিত গল্প প্রচার হওয়া সামাজিক অপরাধই।' (এখন অনেক নেচেছি, হে গোপাল)

যেমন রাহুলজী পাঁচ খণ্ডে 'আমার জীবন যাত্রা, লেখার শেষে তাকে শান্ত্রব্ধ করার জন্য “ঘুমকধর শাস্ত্র নামক বই লিখেছেন, তেমনি অনেক প্রবন্ধ লেখার পর প্রবন্ধ নিয়ে সামান্য শান্ত্রগত চর্চাও করেছেন। তার ছাব্রোপযোগী বই “সাহিত্য সহচরে' সেই চর্চা আছে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে প্রবন্ধ সম্পর্কিত এই সাহিত্যচর্চা স্বয়ং তার প্রবন্ধের সামনে বেশ

1 হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

ফিকে; তবুও তার দ্বারা দ্বিবেদীর প্রবন্ধে বৈবিধ্যের আভাস পাওয়া যায়। তিনি অন্তত প্রবন্ধের চার রূপকে স্বীকৃতি দিয়েছেন :

|. বার্তালাপমূলক, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ 'একটি' কুকুর একটি ময়না” যদিও বার্তালাপের অংশ ঠাকুরের জন্য বৈঠক' অন্যত্রও আছে।

2. বন্তৃতামূলক-__“মানুষই সাহিত্যের লক্ষ্য" প্রবন্ধ সত্যিই বক্তৃতা, কিন্তু দ্িবেদিজীর অন্য প্রবন্ধ অন্যত্রও যথাতথা প্রকট হয়েছে।

3. নিয়ন্ত্রণহীন গল্পমূলক-__যেমন “আবার আমের বোল এসেছে" “দেবদারু”, কিন্তু সর্বত্র কিছু না কিছু “গপ্পোতত্ব আছে।

4. স্বগত চিত্তামূলক-_দ্বিবেদীর অধিকাংশে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধই এতে রাখা যেতে পারে, যদিও এই স্বগত চিস্তা হান্কা বিনোদমুক্ত নয়।

5. আচার্য দ্বিবেদী স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে এই ধরনের বিভাজন খুব ভাল নয়, কিন্তু কোনও সন্দেহ নেই যে প্রচলিত শ্রেণী বিভাজন থেকে এটি একটু স্বতন্ত্র আর দ্বিবেদীর প্রবন্ধশৈলির বাহ্যিক বৈবিধ্যকে কিছুদূর পর্যস্ত স্পষ্ট করতে সাহায্য করে। এই আলোচনায় এর বেশি কোনও উপযোগিতা নেই।

প্রবন্ধের দৃষ্টিতে আচার্য হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর লেখা থেকে এক দেডশো পৃষ্ঠার একটি ছোট্ট সংকলন তৈরি করা সহজ কাজ নয়। বর্তমানে যে “আচার্য হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী রচনাবলি” পাওয়া যায় তা প্রায় পাচ হাজার পৃষ্ঠায় ব্যপ্ত এগারো খণ্ডের বিশাল সাহিত্য রচনাবলির অষ্টম এবং নবম খণ্ডে কেবল প্রবন্ধই আছে যাতে প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। এই প্রবন্ধগুলির মধ্য থেকে বাছতে হলে কোনও কঠিন কাজ হতো না। তেমনি যদি কেবল তথাকথিত 'ব্যক্তিব্যঞ্জক প্রবন্ধ” বা “ললিত প্রবন্ধ” নেওয়ার কথা হতো তাহলেও কোনও অসুবিধা হতো না। কিন্তু তাতে হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর চিস্তাধারা এবং সৃজনের সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব হতো না। তার জন্যে তথাকথিত প্রবন্ধের সীমার বাইরে যেতেই হবে। সেইজন্যে এই সংকলনে কবীর গ্রন্থের একটি অধ্যায় রাখতে হয়েছে আর “মেঘদূত : একটি পুরোনো গল্প'র মতো বইয়েরও প্রারস্তিক অংশ নেওয়া হয়েছে। যাকে নিছক টীকা মনে করে প্রায় উপেক্ষিত করা হয়েছে। এইরকম “অনামদাসের পুঁথি যদিও উপন্যাস, তবুও তার প্রস্তাবনায় একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধের স্বাদ আছে বলে যে কোনও প্রবন্ধ সংগ্রহে স্থান পাওয়ার যোগ্য। সত্যি কথা কি, পূর্ণ স্বাধীনতা পেলে আমি দ্বিবেদীর অন্য উপন্যাস থেকেও কিছু অংশ বেছে রাখতাম এবং দেখতাম যে কি করে তাদের স্বতন্ত্র প্রবন্ধ বলে স্বীকার করা না হয়। যাইহোক, এমন কিছু ইচ্ছা থাকে, যা পালন করাই সুখকর।

পরিশেষে একথা বলা জরুরি যে প্রত্যেক সংকলনের মতো এই সংকলনও কিছুদূর পর্যন্ত একাস্ত নিজের_ পছন্দ অপছন্দও নিজের। তবুও অন্যের স্বীকৃতির আশায়! যদি তা “হ্যা”, কিস্তু'র সঙ্গেও গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে পরিতোষ হবে আর সম্ভবত গুরুদেবের আত্মাও দুঃঘী হবে না। এবমস্ত।

নামবর সিং

এক অশোক ফুল

অশোকে আবার ফুল ফূটেছে। এই ছোট্র ছোট্ট লাল লাল ফুলের মনোহর স্তবকে কি মোহন ভাব। অনেক চিস্তাভাবনা করে কন্দর্পদেব লক্ষ লক্ষ মনোহর ফুল বাদ দিয়ে কেবল যে পাঁচটি ফুল নিজের তৃণনীরে স্থান দেওয়ার যোগ্য মনে করেছিলেন, অশোক তার মধ্যে একটি।

কিন্তু পল্পবিত অশোক দেখে আমার মন উদাস হয়ে যায়। এজন্য নয় যে সুন্দর কোনও বস্তুকে হতভাগ্য মনে করায় আমি বিশেষ আনন্দ পাই। কিছু লোক অবশ্য পান। তারা দুরদ্রষ্টা, যা কিছুই সামনে পড়ে, তার জীবনের শেষ মূহুর্তের হিসাবনিকাশ করে নেন; আমার দৃষ্টি এতদূর যায় না। তবুও আমার মন অশোক ফুল দেখে উদাস হয়ে যায়। আমার অস্তর্যামীই হয়তো আসল কারণ জানেন, কিছুটা অনুমান আমিও করতে পারি। বলছি।

ভারতীয় সাহিত্যে, এজন্য জীবনেও, এই ফুলের আসা যাওয়া দুটিই বিচিত্র নাটকীয় ঘটনা। এমন তো কেউ বলতে পারবে না যে, কালিদাসের আগে ভারতবর্ষে এই ফুলের নাম কেউ জানত না; কিন্তু কালিদাসের কাব্যে শোভা সুকুমারত্বের যে ভাব নিয়ে এসেছে তা প্রথমে কোথায় ছিল। নববধূর গৃহপ্রবেশের মতো এই আসায় শোভা গরিমা পবিত্রতা সুকুমারত্ব আছে। হঠাৎ মুসলমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এই মনোহর ফুল সাহিত্যের সিংহাসন থেকে স্থানচ্যুত হলো। যেভাবে বুদ্ধ, বিক্রমাদিত্যের নাম মনে করা হয়, সেইভাবে অশোক ফুলের নাম পরেও মনে করা হতো। কালিদাসের কাছে অশোক অপূর্ব সম্মান পেয়েছে। সুন্দরীদের আসিঞ্জনকারী নূপুর পরা পায়ের মৃদু আঘাতে ফুটত, কোমল গালের ওপর কানের দুল হয়ে ঝুলত আর চঞ্চল নীল চুলের অচঞ্চল শোভা হাজারগুণ বাড়িয়ে দিত। মহাদেবের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করত, মর্যাদা পুরুষোত্তমের হৃদয়ে সীতার ভ্রম সৃষ্টি করত মনোজন্মা দেবতার ইশারায় কাধের ওপরেই ফুটত। অশোক কোনও কুশল অভিনেতার মতোই ঝপ করে রঙ্গমঞ্চে এসে দর্শকদের অভিভূত করে চলে যেত। কেন এরকম হলো? আজও কবিদের দুনিয়ায় কন্দর্পদেবের অন্যান্য বাণের কদর তো একই রকম আছে। অরবিন্দকে কে ভুলেছে, আমকে কেউ তুলেছে আর নীলোৎপলের মায়াত্যাগ কে করতে পেরেছে? নবমল্লিকার অবশ্য এখন বিশেষ আদর

2 হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

নেই; বেশি কদর অবশ্য সে কোনওদিনই পায়নি। অশোককেই ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মন বারবার ভারতীয় রস সাধনার পার হয়ে আসা হাজার বছরের ওপর বর্ষিত হতে চায়। এই মনোহর ফুল কি ভোলার জিনিস? সহৃদয়তা কি হারিয়ে গিয়েছিল? কবিতা কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? না, আমার মন এসব মেনে নিতে তৈরি নয়। উত্তর ভারতে এক তরঙ্গায়িত পত্রের নিষ্ষলা গাছকে অশোক বলা হতে লাগল; অপমান করেই স্মরণ করা হলো। এতো কা ঘায়ে নুনের ছিটে!

কিন্তু আমার স্বীকার করা না করায় কি হয়? খ্রিষ্টাব্দের প্রায় শুরু থেকেই সুন্দর অশোক ফুল ভারতীয় ধর্ম সাহিত্য শিল্পে অদ্তুত মহিমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সেই সময়েই শতাব্দী-পরিচিত যক্ষ গন্ধরবেরা ভারতীয় ধর্ম সাধনাকে একেবারে নতুন রূপে বদলে দিয়েছিল। পণ্তিতেরা হয়তো ঠিকই বলেছেন, গন্ধর্ব এবং কন্দর্প আসলে একই শব্দের আলাদা উচ্চারণ। কন্দর্প দেবের অশোককে বেছে নেওয়া অবশ্যই আর্যেতর সভ্যতার দান। বরুণ কুবের বজপাণি যক্ষপাতি আর্ধেতর জাতির উপাস্য ছিলেন। কন্দর্প যদিও কামদেবতার নাম হয়ে গেছে, তবুও সেটি গন্ধর্বেরই সমার্থক। শিবের সঙ্গে ঝগড়া করতে গিয়ে একবার মার খেয়েছেন, বিষ্ণকে ভয় পেতেন বুদ্ধদেবের সঙ্গে লডাই করতে গিয়ে ফিরে এসেছেন। কিন্তু কন্দর্পদেবও হার মানার পাত্র নন। বারবার হেরে গিয়েও নিচু হননি। নিত্য নতুন অস্ত্রের প্রয়োগ করতেন। অশোক সম্ভবত শেষ অন্ত্র। এই নতুন অস্ত্র দিয়েই ঘায়েল করেছিলেন, শৈবমার্গকে অভিভূত করেছিলেন আর শক্তিসাধনাকে নত করেছিলেন। বজ্বযান কৌলসাধনা এর প্রমাণ আর কাপালিক মত এর সাক্ষি।

রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষকে “মহামানবসমুদ্র” বলেছিলেন। বিচিত্র এই দেশ। অসুর আর্য শক হুন নাগ যক্ষ গন্ধর্ব এসেছে__না জানি কত মানব জাতি এখানে এসেছে আর বর্তমান ভারতবর্ষ গড়তে হাতে হাত মিলিয়েছে। যাকে আজ হিন্দু রীতি-নীতি বলা হয়, তা অনেক আর্য আর্ধেতর উপাদানের অন্তুত মিশ্রণ। এক-একটি পশু, এক-একটি পাখি 'না জানি কত-কত স্মৃতিভার নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত। অশোকেরও নিজস্ব স্মৃতি পরস্পরা আছে। আম বকুল চম্পারও আছে। সব কি আমাদের জানা আছে? যতটা আমরা জানি তারই মানে কি সুস্পষ্ট? না জানি কোন কু-মৃহুর্তে মনোজন্মা দেবতা শিবের ওপর বাণ ছুড়েছিল! শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেল আর “বামন পুরাণ” ষেষ্ঠ অধ্যায়) অনুসারে আমরা জানি যে, তার রত্ুময় ধনুক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে পড়েছিল। রুক্স-মণি দিয়ে তৈরি হাতল ভেঙে পড়ল আর চম্পা ফুল তৈরি হলো। হীরের তৈরি দুই কিনারা ভেঙে পড়ল আর মহুয়া ফুলে বদলে গেল। ভালই হলো। ইন্দ্রনীল মণির তৈরি অগ্রভাগ ভেঙে সুন্দর পাটল ফুলে পরিবর্তিত হলো। এটাও খারাপ হয়নি। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর হলো চন্দ্রকান্ত মণির মধ্যদেশ, যা ভেঙে চামেলি বিদ্রমের তৈরি প্রাস্তভাগ বেলফুল হলো। স্বর্গজয়ী কঠোর ধনুক মাটিতে পড়েই নানান ফুলে বদলে গেল। স্বীয় জিনিস ধরার সঙ্গে মিলিত না হলে মনোহর হয় না।

কিন্তু আমি অন্য কথা ভাবছি। কথার রহস্য কি? এটা কি পুরাণকাবের সুকুমার কল্পনা নাকি সত্যিই এই ফুলগুলি ভারতে গন্ধর্বকের দান? এক নিশ্চিত সময়ের আগে

অশোক ফুল ]

আমাদের সাহিত্যে এই ফুলগুলোর কথাই পাওয়া যায় না। সোম তো নিশ্চিতভাবে গন্ধর্দের থেকে কেনা হতো। ব্রাহ্মণ গ্রন্থে যজ্ঞবিধি বিদান সুরক্ষিত আছে। এই ফুলগুলোও কি তাদের থেকেই পাওয়া?

ভাবনাচিস্তা না করেই কিছু কথা ঘুরে ফিরে আমার মাথায় আসছে। যক্ষ গন্ধর্বদের দেবতা কুবের সোম অ্পরা_-যদিও পরবর্তী ব্রাহ্মণ গ্রন্থে স্বীকৃত, তবুও প্রাচীন সাহিতে; অপদেবতা রূপেই পাওয়া যায়। বৌদ্ধসাহিত্যে তো বেশ কয়েকবার বুদ্ধদেবকে বাম দিয়েছে বলা হয়েছে। মহাভারতে এমন অনেক উপাখ্যান আছে যাতে সস্তানকামী স্ত্রী সম্তানকামনা নিয়ে বৃক্ষের অপদেবতা যক্ষের কাছে যেত। যক্ষ যক্ষিণীকে সাধারণত বিলাসী উর্বরতাজনক দেবতা মনে করে হতো। কুবের তো অক্ষয় নিধির অধীশ্বরও যক্ষা রোগের সঙ্গেও এদের সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়। ভরহুত বোধগয়া সাচি ইতাদি স্থানের মূর্তিতে সন্তানকামী স্ত্রীরা যক্ষের সান্নিধ্যের জন্য গাছের কাছে যাচ্ছে, খোদাই করা আছে। এই গাছের কাছে খোদাই-করা মূর্তির নারীরা প্রায় নগ্ন; কোমরে চওড়া মেখলা পরা। এই সব গাছেদের মধ্যে অশোকই সবচেয়ে রহস্যময়। সুন্দরীদের চরম-তাডনে তাতে দোহদের সপ্চার হয় আর পরবতী ধর্মগ্রন্ন থেকে জানা যায়, চৈত্র শুক্লা অষ্টমীতে ব্রত করলে এবং অশোকের আটটি পাতা খেলে নারীর সম্তান কামনা ফলবতী হয়। “অশোক- কল্প” অনুসারে অশোক ফুল দু রকমের, শাদা নীল। তান্ত্রিক ক্রিয়ায় সিদ্ধিপ্রদ মনে করে শাদা ফুল ব্যবহৃত হয় আর লাল স্ববর্ধক। সমস্ত কথার রহস্য কি? আমার মন প্রাচীনযুগের কুম্বাটিকাচ্ছন্ন আকাশে সুদূরে উড়ে যেতে চায়। হায়, ডানা কোথায়?

এটা আমার মনে হয় প্রাচীনযুগের কথা। আর্যদের লেখা সাহিত্যই আমাদের কাছে বর্তমান। সেখানে সব কিছু আর্য দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে। আর্যদের সঙ্গে নানা জাতির সংঘর্ষ হয়েছে। কেউ কেউ তাদের অধীনতা স্বীকার করেনি, তারা কিছুটা অহংকারী ছিল। ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল। পুরাণের এর প্রমাণ আছে। এত পুরোনো কথা যে সমস্ত যুযুধান শক্তি পরে দেবযোনি-জাতি মেনে নিয়েছিল। প্রথম লড়াই সম্ভবত অসুরদের সঙ্গে হয়েছিল। এরা খুব অহংকারী জাতি ছিল। আর্ধদের প্রভৃত্ব এরা কখনও স্বীকার করেনি। তারপর দানব দৈত্য রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে। গন্ধর্ব এবং যক্ষদের সঙ্গে কোনও যুদ্ধ হয়নি। তারা সম্ভবত শান্তিপ্রিয় জাতি ছিল। ভরহুত সীচি মথুরায় পাওয়া যক্ষিণী মূর্তিগুলির গড়ন দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়, এরা পাহাড়ি জাতি ছিল। হিমালয় প্রদেশই গন্ধর্ব ক্ষ অন্সরাদের নিবাসস্থান। আজকের ভাষায় এদের সমাজ সম্ভবত 'পুনালুয়ান সোসাইটি” ছিল, সম্ভবত তার থেকেও আদিম। কিন্তু নাচগানে তারা ছিল পারদর্শী। যক্ষ ধনীও ছিল। তারা বানর ভাল্লুকের মতো কৃতপূর্ব অবস্থায়ও ছিল না আর রাক্ষস বা অসুরদের মতো ব্যবসা বাণিজ্য করার মতো অবস্থায়ও ছিল না। তারা মণি রত্বের সন্ধান জানত, পৃথিবীর গর্ভে জমা রত্ুকোষের খবর রাখত এবং সহজেই ধনী হয়ে যেত। সম্ভবত এইজন্যই তাদের মধ্যে বেশি বিলাসিতা ছিল। পরে এদের অত্যন্ত সুখি জাতি মনে করা হতো, যক্ষ গন্ধর্ব একই শ্রেণীর ছিল, কিন্তু দুই শ্রেণীর আর্থিক অবস্থা কিছুটা আলাদা ছিল; কীভাবে কন্দর্পদেবকে তার সৈন্যসমেত ইন্দ্রের মোসাহেব হতে হয়েছিল, তা খুবই মনোরঞ্জক গল্প। কিন্তু এখানে

4 হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

এসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাটা কেন? সত্যি কথা হলো, অনেক পুরোনো যুগে নানান জাতির সঙ্গে আর্দের লড়তে হয়েছিল। তাঁরা অহংকারী ছিল, হার স্বীকার করতে তৈরি ছিল না, পরবতী সাহিত্যে ঘৃণাভরে তাদের স্মরণ করা হয়েছে। আর যারা সহজেই বন্ধু হয়ে গিয়েছিল, তাদের প্রতি উপেক্ষা অবস্তার ভাব ছিল না। অসুর রাক্ষস দানব দৈত্যেরা প্রথম গোষ্ঠীভূক্ত এবং যক্ষ গন্ধর্ব কিন্নর সিদ্ধ বিদ্যাধর বানর ভালু_ এরা দ্বিতীয় গোষ্ঠীভুক্ত। পরবর্তী হিন্দু-সমাজ এদের সবাইকে অদ্ভুত শক্তির আশ্রয় বলে মনে করত, সবাই দেব-বুদ্ধির পোষণ করত।

অশোক বৃক্ষের পৃজা গন্ধর্ব যক্ষদের দান। প্রাচীন সাহিত্যে এই বৃক্ষ-পৃজা উৎসবের বেশ সরস বর্ণনা পাওয়া যায়। আসলে অশোক নয়, তারা অধিষ্ঠাতা কন্দর্পদেবের পূজা করত। বলা হতো 'মদনোৎসব'। মহারাজা ভোজের “সরস্বতী কণ্ঠাভরণ' থেকে জানা যায় যে ব্রয়োদশীর দিন এই উৎসব হতো। “মালবিকাগ্নিমিত্র” 'রত্বাবলী” তেও এই উৎসবের অত্যন্ত সরস এবং সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায়। আমি যখন অশোক ফুলের লাল লাল থোকো দেখি, আমার চোখের সামনে তখন প্রাটীন পরিবেশ ভেসে ওঠে। রাজপরিবারে সাধারণত রানি নিজের সুনুপুর চরণের আঘাতে রহস্যময় এই বৃক্ষকে পুষ্পিত করতেন। কখনও কখনও নিজের জায়গায় রানি অন্য কোনও সুন্দরীকে নিযুক্ত করতেন। কোমল হাতে অশোক পল্লবের কোমলতর গুচ্ছ, আলতায় রাঙানো নূপুর পরা চরণের মৃদু আঘাতে অশোকের পাদদেশ আহত হতো-_নিচে মৃদু রণরুণ আর ওপরে লাল ফুলের উল্লাস। সুন্দরীরা আবীর কুমকুম চন্দন পৃষ্পসম্ভার দিয়ে প্রথমে কনর্পদেবের পৃজা করত, পরে ভঙ্গিমা দিয়ে পতির চরণে বসস্ত পুষ্পের অঞ্জলি ছড়িয়ে দিত। সত্যি সত্যিই খুব মাদক- উৎসব। অশোক স্তবকে আজও সেই মাদকতা আছে; কিন্তু কে পাত্তা দেয়? এই ফুলের সঙ্গে কি মামুলি স্মৃতি জড়িত?

ভারতবর্ষের সুবরণযুগ এই ফুলের প্রত্যেকটি পাপড়িতে দোল খায়। বলা হয় পৃথিবী বুবই ভুলো। কেবল ততটাই মনে রাখে যা দিয়ে তার স্বার্থ সিদ্ধি হয়। বাকি সব ছুড়ে ফেলে এগিয়ে যায়। সম্ভবত অশোক কোনও স্বার্থ সিদ্ধিতে লাগেনি। পৃথিবী তাকে মনে রাখবে কেন? সমস্ত পৃথিবী তো স্বার্থে ভরা।

অশোক-বৃক্ষ যতই মনোহর হোক, যতই রহস্যময় হোক যতই অলঙ্কারময় হোক, আসলে সে সেই বিশাল সামস্ত সভ্যতার পরিষ্থৃত প্রতীক, যারা সাধারণ প্রজার শ্রমদ্ারা পালিত, তাদের রক্তকণিকার সার খেয়ে বেড়ে উঠেছিল আর কোটি কোটি মানুষকে উপেক্ষা করে সমৃদ্ধ হয়েছিল। তা আর বলার অপেক্ষা করে না। সামন্তরা হারিয়ে গেছে সমাজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে আর মদন-উৎসবের ধৃূমধামও শেষ হয়ে গেছে। সম্ভানকামিনীরা গন্ধর্বের চেয়েও বেশি শক্তিশালী দেবতাদের বরদান পেতে লাগল-_পির ভূত ভৈরব কালী-দুর্গারা যক্ষের ইজ্জত কমিয়ে দিল। দুনিয়া নিজের রাস্তায় এগিয়ে গেল, অশোক রইল পেছনে পড়ে।

মানব জাতির দুরদ্ম-নির্মম মৃত্যুর হাজার হাজার রূপ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মানুষের জীবনীশক্তি বড়ই নির্মম, সে সভ্যতা সংস্কৃতির বৃথা মোহ পিষে এগিয়ে চলে।

অশোক ফুল 5

না জানি কত ধর্মাচার বিশ্বাস উৎসব ব্রত ধুয়ে মুছে এই জীবনধারা এগিয়ে গেছে। সংঘর্ষ মানুষকে নতুন শক্তি দিয়েছে। আমাদের সামনে আজ সমাজের যে রূপ, তা না জানি কত গ্রহণ আর ত্যাগের পরিণাম। দেশ জাতির বিশুদ্ধ সংস্কৃতি তো পরের কথা। সবকিছুতেই ভেজাল, সবকিছুই অবিশুদ্ধ। মানুষের বাঁচার ইচ্ছাই কেবল শুদ্ধ। সে গঙ্গার অবাধিত-অনাহত ধারার মতো সবকিছু হজম করার পরও পবিভ্র। সভ্যতা সংস্কৃতির মোহ ক্ষণিক বাধা উপস্থিত করে, ধর্মাচারের সংস্কার কিছু সময়ের জন্য এই ধারার সঙ্গে টক্কর নেয়, কিন্তু এই দুর্দম প্রবাহে সবকিছুই বয়ে যায়। এই জীবনীশক্তিকে যতই সমর্থ করে, ততই তার অংশ হয়ে যায়, বাকি ফেলে দেওয়া হয়। ধন্য মহাকাল, তুমি কতবার মানবদেবতার দপ্চচুর্ণ করেছ, ধর্মরাজের কারাগারে বিপ্লব করেছ, যমরাজের নির্দয় তারল্য পান করেছ, বিধাতার সর্বকর্তৃত্বের অহংকার চূর্ণ করেছ। আজ আমাদের ভিতরে যে মোহ, সংস্কৃতি শিল্পের নামে যে আসক্তি, ধর্মাচার সত্যানিষ্ঠার নামে যে জড়তা, তার মধ্যে কতটা তোমার কুষ্ঠনৃত্যে ধবংস হয়ে যাবে, কে জানে। মানুষের জীবনপ্রবাহ তবুও নিজের মন্ত চালে এগিয়ে যাবে। আজ অশোকের পুষ্পস্তবক দেখে আমার মন উদাস হয়ে গেছে, জানি না কাল কোন জিনিস দেখে কোন সহদয়ের ঘন উদাস হয়ে উঠবে। যে কথাগুলো আমি মূল্যবান মনে করছি আর প্রচারের জন্যে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা শুকিয়ে ফেলছি, কে জানে তার মধ্যে কটা বেঁচে থাকবে আর কটা বয়ে যাবে। আমি কি শখ করে উদাস হয়েছি? মায়া কাটালেও কাটে না। সে যুগের শিল্পসাহিত্য মন চঞ্চল করে ফেলেছে, অশোকফুলই নয়, কিশলয়ও মনটাকে খোঁচাচ্ছে। কালিদাসের মতো কল্পকবি বলেছেন, অশোক ফুলই নয়, কিশলয়ও সদামন্ত করে তোলে, অবশ্য এর একটি শর্ত ছিল : সেটি দয়িতার কানে দুলতে থাকবে। “কিশলয় প্রসব্যোপি বিলাসিনাং মদয়িতা দয়িতা শ্রবণার্পিতঃ! কিন্তু ডালে লম্বিত, বায়ুললিত কিশলয়েও মাদকতা আছে। আমার শিরায় শিরায় আজ অরুণ উল্লাসের ঝঞ্জা উঠছে। সত্যিই আমি উদাস।

আজ যাকে আমরা বহুমূলা সংস্কৃতি মনে করছি, তা কি এরকমই থাকবে? সম্রাট সামস্তেরা যে আচার-নিষ্ঠাকে এত মাদক আর মোহকরূপ দিয়েছে, তা হারিয়ে গেছে। ধর্মাচার্যরা যে জ্ঞান বৈরাগ্যকে মহার্থ ভেবেছিলেন, তাও শেষ হয়ে গেছে; মধ্যযুগের মুসলমান অভিজাতদের অনুকরণে যে রসরাশি উপচে উঠেছিল, তা বাম্পের মতো উবে গেল, তাহলে কি মধ্যযুগের কঙ্কালে লেখা ব্যবসায়িক যুগের কমল কি এরকমই থাকবে? মহাকালের প্রত্যেক পদাঘাতে ধরিন্রী বসে যাবে। তার কুঠনৃত্যের প্রত্যেক পদক্ষেপ কিছু না কিছু জড়িয়ে নিয়ে যাবে। সব বদলাবে, সব বিকৃত হবে, সব নবীন হবে।

ভগবান বুদ্ধ মারবিজয়ের পর বৈরাগীদের পশ্টন তৈরি করেছিলেন। মার আসলে মদনেরই নামাস্তর। তিনি কি মধুর মোহক সাহিত্য দিয়েছেন। কিন্তু না জানি কবে যক্ষদের দেবতা বজ্রপাণি এই বৈরাগ্যপ্রবণ ধর্মে প্রবেশ করেন আর বোধিসত্্দের শিরোমণি হয়ে যান। তারপর বজ্রযানের অপূর্ব ধর্মমার্গ প্রচলিত হয়। ত্রিরত্বে মদনদেবতা স্থান পায়। সে এক আজব ঝড়। তাতে বৌদ্ধ শৈব শাক্ত সব রয়ে গেল। সেই সময়ে তা সুন্দরীসাধনতৎপরাণাং যোগশ্চ ভোগশ্চ করস্থ এব'র মহিমা প্রতিষ্ঠিত হলো। কাব্য শিল্পের মোহক অশোক অভিচার সাহায্য করল। আমি আশ্চর্য হয়ে যোগ ভোগের

6 হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

মিলনলীলা দেখছি। এটাও জীবনীশক্তির কি দুর্দম অভিযান। কত ধ্বংসের পর অপূর্ব এই ধর্মমতের সৃষ্টি হয়েছিল; কে জানাবে? অশোক স্তবকের প্রত্যেকটি ফুল তার প্রত্যেকটি দল, এই বিচিত্র পরিণতিব এতিহ্য বয়ে নিয়ে আসছে। কি রকম ঝীকড়া গুল্ম।

কিন্তু উদাস হওয়াই বেকার। আজও অশোক সেইরকম আনন্দে আছে, দু হাজার বছর আগে যেমন ছিল। কোথাও কিছুই নষ্ট, হয়নি, কিছুই বদলায়নি। মানুষের মনোবৃত্তি বদলে গেছে, যদি না বদলে এগিয়ে যেত, তাহলে হয়তো তাও বদলাত না। আর যদি না বদলাত ব্যবসায়িক সংঘাত আরম্ভ হয়ে যেত, মেশিনের রথ ঘর্ঘর করে চলা শুরু করত, বিজ্ঞানের সবেগ দৌড় আরম্ভ হতো; তাহলে খুব খারাপ হতো। আমরা পিশে যেতাম। ভালই হয়েছে যে সে বদলে গেছে। পুরোপুরি কোথায় বদলেছে? কিন্তু বদলাচ্ছে তো অশোক ফুল সেই মন্ততায় হাসছে। পুরোনো মন নিয়ে এদের দেখার মানুষেরা উদাস। সে নিজেকে পণ্ডিত মনে করে। পাণ্ডিত্যও একটি বোঝা, যত ভারি হয় ততই তাড়াতাড়ি ভরাডুবি করে। জীবনের অঙ্গ হয়ে গেলে সহজ হয়ে ওঠে। তখন আর বোঝা থাকে না। সেই অবস্থায় উদাসও করে না। কোথায়! অশোকের কিছুই ক্ষতি হয়নি। কি মন্ততায় দুলছে। কালিদাস নিজের মতো করে রসাস্বাদন করতে পেরেছিলেন। আমিও পারি। উদাস হওয়া বেকার।

শিরীষ ফুল

যেখানে বসে লিখছি তার সামনে-পিছনে ডাইনে-বায়ে অনেক শিরীষ গাছ আছে। জৈষ্ঠের গনগনে রোদ্রে পৃথিবী যখন নির্ধুম অগ্নিকুণ্ডে হয়ে গেছে শিরীষ আপাদমস্তক ফুলে ফুলে ভরে আছে। খুব কম ফুলই এমন গরমে ফোটার সাহস করে। কিন্নিকার অমলতাসের কথা আমি ভুলে যাচ্ছি না। চারপাশে তাও অনেক আছে। কিন্তু, শিরীষের সঙ্গে অমলতাসের তুলনা করা যায় না। সে বসস্তকালে পলাশের মতো পনেরো-কুড়ি দিনের জন্য ফোটে; কবীরদাস রকম দিন পনেরো জন্য ফুটে ওঠা পছন্দ করতেন না। আবার কি, দিন দশ ফুটে আবার খডখড়ে কাঠ-_“দিন দশ ফুটে খডখড়ে হয়ে যায় পলাশ'। এ-রকম লাঙুলীর চেয়ে তো ল্যাজছাড়াই ভাল। ফুল হলো শিরীষ'। বসস্ত আসতেই ফুটে ওঠে; আষাঢ় পর্যস্ত অবশ্যই মত্ত থাকে। মন মজে গেলে তো ভরা ভাদরেও নির্ঘাৎ ফুটতে থাকবে। শুমোটে যখন প্রাণ শুকিয়ে যায়, একমাত্র শিরীষ কালজয়ী অবধূতের মতো জীবনের অজেয়তার মন্ত্র প্রচার করতে থাকে। সবুজ ফুলপাতা দেখে মুগ্ধ হওয়ার

অশোক ফুল 7

মতো কবিহাদয় যদিও বিধাতা আমাকে দেননি, কিন্তু নিতান্ত ঠুঠোও নই। শিরীষ ফুল আমার মনে অল্প হিল্লোল সৃষ্টি করে।

শিরীষ ছায়াতরুও বড় হয়। প্রাচীন ভারতে ধনীরা নিজের বাড়ির চারপাশে যে সব মঙ্গলজনক গাছ লাগাত, শিরীষ তাদের মধ্যে একটি (বৃহৎসংহিতা 5513)। অশোক অবিষ্ট পুত্রাগ শিরীষ ছায়াঘেরা ঘন মসৃণ শ্যামলিমায় ঢাকা বৃক্ষ-বাটিকা অবশ্যই সুন্দর লাগত। বাৎস্যায়ন “কামসূত্র বলেছেন যে, বাড়ির সঘন ছায়াভরা বৃক্ষছায়াতেই দোলনা ঝোলানো উচিত। প্রাচীন কবিরা বকুল গাছে একরকম দোলনা লাগানোর পক্ষপাতী ছিলেন, কিন্তু শিরীষ কি খারাপ? এর ডাল অপেক্ষাকৃত দুর্বল, কিন্তু দোল খাওয়া নারীদের ওজনও তো বেশি নয়। কবিদের এই তো দোষ, তারা ওজনের কথাই মনে রাখে না। আমি ভঁডিওয়ালা নরপতিদের কথা বলছি না, ইচ্ছে করলে তারা লোহার গাছ তৈরি করে নিন।

সংস্কৃতসাহিত্যে শিরীষ ফুল অত্যন্ত কোমল মানা হয়েছে। আমার অনুমান কালিদাসই প্রথম এই কথা প্রচার করেছেন। এই ফুলের প্রতি তার কিছুটা পক্ষপাতিত্ব ছিল (আমারও আছে)। বলেছেন, শিরীষ ফুল কোনও ভ্রমরের পায়ের নরম চাপই সহ্য করতে পারে, পাখিদের পায়ের ভার কখনই নয় “পদং সহেত ভ্রমরস্য পেলবং শিরীষ পৃষ্পং পুনঃ পত্রত্রিণাম্‌।' আমি এত বড় কবির কথার প্রতিবাদ কি করে করি? শুধু প্রতিবাদ করার সাহস না হলেও কিছু খারাপ হতো না, ইচ্ছাও তো নেই। যাক আমি অন্য কথা কোমল, ভুল, এর ফল এত মজবুত যে নতুন ফুল আসার পরও জায়গা ছাডে না। যতক্ষণ নতুন ফুল পাতা মিলে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে না দেয় ততক্ষণ জমে থাকে। বসস্ত খড়খড় করতে থাকে। এদের দেখে আমার সেই নেতাদের কথা মনে পড়ে, যারা কোনওভাবেই সময়ের দিশা চিনতে পারে না আর, যতক্ষণ নতুন গাছ তাদের ধাক্কা মেরে তাড়িয়ে না দেয় ততক্ষণ জমে থাকে।

ভাবি, সময় থাকতে পুরোনোদের এই অধিকারলিক্সা কেন সাবধান হয়ে যায় না? জরা মৃত্যু দুইই জগতের অতিপরিচিত এবং অতিপ্রামাণিক সতা। তুলসীদাস আফশোস করেই এর সত্যতার ওপর মোহর লাগিয়েছিলেন___“ধরার প্রমাণ এই তুলসী, যা ফলে তা ঝরে, যা জলে তা নেভে।' আমি শিরীষ ফল দেখে বলি__ফলার পরেই কেন বোঝো না বাছা, যে ঝরে যেতেই হবে। কে শোনে? মহাকাল দেবতা সপাং-সপাং চাবুক চালাচ্ছেন; জীর্ণ-শীর্ণরা ঝরে যাচ্ছে; যাদের প্রানকণা একটু উধর্বমুখী, তারা টিকে যাচ্ছে। দুরস্ত প্রাণধারা আর সর্বব্যাপী কালাগ্নির সংঘাত নিরম্তর চলছে। মূর্খ মনে করে, যে যেখানে দীড়িয়ে আছে অনেকদিন, সেখানে থাকলে কাল, দেবতার চোখে পড়বে না। তারা অবোধ। নড়া চড়া করো, জায়গা বদলাও, সামনের দিকে মুখ করে থাকলে চাবুক থেকে রেহাই পেতেও পার। জমলেই মারা পড়বে।

এক একবার মনে হয়, শিরীষ এক অক্তুত অবধৃত। দুঃখ হোক বা সুখ, হার মানে না। কারও সাতেপাচে নেই। যখন পৃথিবী আর আকাশ পুডতে থাকে, তখনও না জানি মহাশয় কোথা থেকে নিজের জন্যে রস শুষতে থাকে। অষ্টপ্রহর আনন্দে মত্ত থাকে।

8 হজারীপ্রসাদ ছ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

একজন উত্ভিদবিদ আমাকে বলেছেন, শিরীষ সেই শ্রেণীর গাছ যারা বায়ুমণশ্ডল থেকে রস সংগ্রহ করে। অবশ্যই করে হয়তো। না হলে ভয়ঙ্কর লু চলার সময় এত কোমল তন্তজাল এরকম সুকুমার কেশর জন্মায় কি করে? অবধৃতদের মুখ থেকেই পৃথিবীর সবচেয়ে সরস লেখা সৃষ্টি হয়েছে। কবীর, অনেকটা শিরীষের মতোই ছিলেন, মত্ত আর বেপরোয়া অথচ সরস মাদক। কাল্দাসও অবশ্যই অনাসক্ত যোগী ছিলেন। শিরীষফুল ফুড়ে মত্ততায় ফুটতে পারে আর “মেঘদূত” কাব্যও সেইরকম অনাসক্ত অনামিল উন্মুক্ত হৃদয়ে সৃষ্টি হতে পারে। যে কবি অনাসক্ত হতে পারে না, ফকড় হতে পারে না, যে কৃতকর্মের হিসাবনিকাশেই জড়িয়ে থাকে, সে আবার কবি কিসের? কর্ণাট রাজপ্রিয়া বিজ্জিকা দেবী গর্ব করে বলেছিলেন, প্রথম কবি ব্রন্মা, দ্বিতীয় বাল্মিকী আর তৃতীয় ব্যাস। প্রথমজন বেদ, দ্বিতীয়জন রামায়ণ তৃতীয়জন মহাভারত দিয়েছেন। এছাড়া যদি কেউ কবি হওয়ার দাবি করেন, তাহলে আমি কর্ণাট রাজের প্রিয় রানি তার মাথায় আমার বাঁ পা রাখি 'তেষাং মুর্সি দদামি বামচরণং কর্ণাট রাজপ্রিয়া! আমি জানি এই উপালস্তে পৃথিবীর কোনও কবি হারেনি, তার মানে এই নয় যে কেউ লঙ্জিত না হলে তাকে ধমকও দেওয়া যাবে না। আমি বলি, যদি কবি হতে হয়, তাহলে বন্ধু, ফরুড় হও। শিরীষের মন্ততা দেখ। কিন্তু অভিজাতই আমাকে শিখিয়েছে যে কেউ কারও কথা শোনে না। মরুক গে।

কালিদাস ওজন ঠিক রাখতে পারতেন, কারণ তিনি অনাসক্ত যোগীর স্থির প্রজ্ঞতা আর বিদগ্ধ প্রেমীর হৃদয় পেয়েছিলেন। কবি হলে কি হয়? ছন্দ তৈরি করতে পারি, ছন্দ মেলাতে পারি__কালিদাসও পারতেন-_এইজন্যে আমরা একই শ্রেণীভুক্ত হতে পারি না। এ-রকম প্রাচীন কোনও একজন সহদয় দাবিদার ধিক্কার করে বলেছিলেন-_“বয়মপি করয়ঃ করয়ঃ কবয়স্তে কালিদাসস্যা।” মুগ্ধ আর বিস্মিত হয়ে কালিদাসের এক একটি শ্লোক পড়ে আশ্চর্য হয়ে যাই। শিরীষ ফুলেরই উদাহরণ নেওয়া যাক। শকৃত্তলা খুব সুন্দরী ছিলেন। সুন্দর হলেই কি হওয়া যায়? দেবা উচিত যে সেই সৌন্দর্য কত সুন্দর হৃদয় থেকে ডুব দিয়ে বেরিয়েছে। শকুস্তলা কালিদাসের হৃদয় থেকে বেরিয়েছিল। বিধাতারও কোনও কাপণ্য ছিল না। কবিরও নয়। রাজা দুম্মস্তও ভাল প্রেমিক ছিলেন। তিনি শকুস্তলার ছবি এঁকেছিলেন, কিন্তু থেকে-থেকেই তার মন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠত। উহু! কোথাও কিছু না কিছু বাকি রয়ে গেছে। অনেক দেরিতে তিনি বুঝতে পারলেন, কানে শিরীষ ফুল দিতে তুলে গেছেন যার কেশর গাল পর্যস্ত ঝুলছিল, শরৎ চন্দ্রের কিরণের মতো কোমল শুন্ মৃণালের হার রয়ে গেছে:

কৃতং কর্ণার্পিত বন্ধনং সখে শিরীষ মদাণগুবিলম্থি কেসরং। বা শরচ্চন্দ্রমরীচি কোমলং মৃণলি সূত্রং রচিতং স্তনাত্তরে।

এই শ্লোক না লিখলে মনে করতাম, কালিদাসের সঙ্গে অন্য কবিদের কোনও পার্থক্য নেই__ সৌন্দর্যে মুদ্ধ, দুঃখে অভিভূত, সুখে গদগদ! কিন্তু কালিদাস সৌন্দর্যের

কুটজ | 9

বাইরের আবরণ ভেদ করে তার ভেতরে পৌঁছে যেতে পারতেন, দুঃখ হোক বা সুখ, তিনি সেই অনাসক্ত কৃপীল যে নির্দলিত আখের থেকে রস টেনে নেয়, তার মতো নিজের ভাবরস টেনে নিতেন। কালিদাস মহান ছিলেন, কারণ তিনি অনাসক্ত থাকতে পেরেছিলেন। অনেকটা এই রকমের অনাসক্তি আধুনিক হিন্দি কবি সুমিত্রানন্দন পঙ্থের আছে। কবিবর রবীন্দ্রনাথেরও এই অনাসক্তি ছিল। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, 'রাজ্যোদ্যানের সিংহদ্বার যতই অভ্রভেদী হোক না কেন, তার শিল্পকর্ম যতই সুন্দর হোক না কেন, তা কখনই বলে না যে এখানেই সব পথের শেষ। আসল গন্তব্যস্থল তাকে অতিক্রম করার পরেই হয়, এটা জানানোই তার কর্তব্য ফুল হোক বা গাছ, তা নিজেই নিজের মধ্যে শেষ হয় না। অন্য কিছু দেখানোর জন্য একটি আঙুল। সেটি সংকেত।

শিরীষতরু সত্যিই সিদ্ধ অবধূতের মতোই আমার মনে এমন তরঙ্গের সৃষ্টি করে যা ওপরের দিকেই উঠতে থাকে। কষ্টদায়ক রৌদে সে এত সরস কি করে থাকে? বাইরের পরিবর্তন, রৌদ্র বর্ষা ঝড় লু সত্য নয়? আমাদের দেশে এই মারপিট অগ্নিদাহ, লুট পাট, বুনখারাপির ঝড় বয়ে গেল, তার মধ্যেও কি স্থির থাকা যায়ঃ শিরীষ পেরেছিল। আমার দেশের এক বৃদ্ধ পেরেছিল। আমার মন কেন প্রশ্ন করে যে, এমনটা কি করে সম্ভব হলো? কারণ শিরীষও অবধৃত। শিরীষ বায়ুমণ্ডল থেকে রসসংগ্রহ করে এত কোমল আর এত কঠোর হয়েছে। গান্ধীও বায়ুমণ্ডল থেকে রস সংগ্রহ করে এত কোমল আর এত কঠোর হতে পারতেন। আমি যখন যখন শিরীষের দিকে দেখি তখন খুব কষ্ট হয়__হায়, সেই অবধৃত আজ কোথায়!

কুটজ

বলা হয়, পর্বত শোভা নিকেতন। হিমালয় নিয়ে বলার কি আছে! পূর্ব আর অপার সমুদ্র মহোদধি আর রত্বাকর__দুটিকেই দুহাত দিয়ে পরিমাপ করা হিমালয়কে “পৃথিবীর মানদণ্ড ' বললে দোষের কি আছে? কালিদাস এরকমই বলেছিলেন। এর পাদদেশে সুদূর বিস্তৃত এই শৃঙ্খলা, লোকে “শিবালিক শৃঙ্খলা বলে। শিবালিকের মানে কি? শিবালিক, শিবের জটার নিন্নভাগ নয়তোঃ এই রকমই মনে হয়। শিবের লটপট জটাই এত শুকনো, শীরস কঠোর হতে পারে। যদিও অলকানন্দার স্রোতে এখান থেকে অনেক দূরে, কিন্তু শিবের অলক তো দূর-দূর পর্যন্ত ছ্যাতরানোই থাকে হয়তো। সম্পূর্ণ হিমালয় দেখেই হয়তো কারও মনে সমাধিস্থ মহাদেবের মুর্তি স্পষ্ট হয়েছিল। হয়তো এই গিরিশ্রেণী সেই সমাধিস্থ

|0 হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদীর প্রবন্ধ সংগ্রহ

মহাদেবের অলকজালের নিচু অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। কোথাও কোথাও অজ্ঞাত নাম গোত্রের ঝোপঝাড় আর নির্লজ্জের মতো দীডিয়ে থাকা গাছ দেখা যায়, কিন্তু আর কোনও সবুজ নেই। দুর্বা পর্যস্ত শুকিয়ে গেছে। কালো কালো পাথর আর মাঝে মাঝে শুক্ষতার অস্থিত্ব প্রকট করা রক্তাভ বালির চড়া। রস কোথায়? এই যে বেঁটে অথচ বৈভবশালী গাছ গরমের ভয়ংকর মার খেয়ে আর খিদে তৃষ্তার নিরস্তর চোট সহ্য করেও বেচে থাকছে, এদের কি বলা যায় £ খালি বেঁচে থাকছে তাই নয়, হাসছেও। নির্লজ্জ নাকি? আপনভোলা নাকি? কখনও কখনও যাঁরা ওপরে নির্লজ্জ হন, তাদের শিকড খুব গভীরে থাকে। এরাও পাষাণের বুক চিরে না জানি কোন অতল গহুর থেকে নিজের ভোগ্য টেনে আনে।

শিবালিকের শুকনো নীরস পাহাড়ে হাসতে থাকা এই গাছ দ্বন্দাতীত, আপনভোলা। আমি কারও নাম জানি না, বংশ জানি না, শীল জানি না, কিন্তু মনে হয় এরা যেন অনাদি কাল থেকেই আমাকে চেনে। এদের মধ্োই একটা ছোট্ট, খুবই বেঁটে গাছ আছে, পাতা খুব চওড়া আর বড়। ফুলে এমন ভরা. কি বলব। তাজ্জব হাবভাব, মনে হয় যেন হাসছে। যেন বলছে, কি তুমি আমায় চেন না? চিনি অবশ্যই চিনি। মনে হয় অনেকবার দেখেছি। চিনি, নির্মমতার সাথী, তোমায় ভালই চিনি। নাম ভুলে যাচ্ছি। প্রায় ভুলে যাই। চেহারা দেখে চিনে নিই, নাম মনে পড়ছে না। কিন্তু এমন নাম যে যতক্ষণ রূপের আগে না আসছে ততক্ষণ রূপের পরিচয় অসম্পূর্ণ থাকে। ভারতীয় পণ্ডিতদের হাজার বার নিংডানো প্রশ্ণ সামনে এসে গেল-- রূপ প্রজন না নাম? নাম বড় না রাপ? পদ আগে না পদার্থ? পদার্থ সামনে, পদ দেখা যাচ্ছে না। মন ব্যাকুল হয়ে উঠল, স্মৃতির ডানা ছড়িয়ে সুদূর অতীতের কানের কাছে ঝুঁকলাম। ভাবি, এত ব্যাকুল হওয়ার কি আছে? নামে কি আসে যায়__হোয়াটস্‌ দেয়ার ইন নেম? যদি নামের প্রয়োজনই হয়, তাহলে হাজার নাম দেওয়া যায়, সুস্মিতা গিরিকান্তা বনপ্রভা শুভ্রকিরীটি, মদোদ্ধতা বিজিতাতপা, অলকাবিতংসা, অনেক নাম আছে অথবা পুরুষালি নামও দেওয়া যেতে পারে__ অকুতোভয় গিরিগৌরব কুটোল্লাস অপরাজিত পাহাড়ফোড় পাতালভেদ! কিন্তু মন মানে না। নাম এজন্য বড় নয়, কারণ সেটা কেবল নাম। নাম বড় হয়, কারণ তাতে সামাজিক স্বীকৃতি থাকে। রূপ ব্ক্তিসত্য, নাম সমাজসত্য। নাম সেই পদকে বলা হয় যার ওপর